অশোক সেনগুপ্ত
যাদবপুরে রেলের জমি থেকে বুলডোজার চালিয়ে দখলদার উচ্ছেদে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকে খুশি, অনেকে অখুশি। কথা বললাম নানা শ্রেনীর লোকের সঙ্গে।
অখুশি মূলত স্বার্থান্বেষীরা।

পূর্ব যাদবপুরের বাসিন্দা, কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী, আবাল্য পরিচিত দেবাশিস (সুঁটু) সাহা এই প্রতিবেদককে দেখে প্রশ্ন করলেন, “আদানীকে কেন প্রধানমন্ত্রী মোদী সমর্থন করছেন? সব সম্পত্তি কেন একে একে বেচে দেওয়া হচ্ছে?” সুঁটু-র দাবি, সেগুলো নিয়ে আরও লেখালেখি হোক!
রাতের অভিযানে বাধাদানকারীদের মধ্যে ছিলেন দুই পড়ুয়া আকাশ এবং অর্ঘ্যজিৎ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র পাঠ্যক্রমের দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন। আকাশ পায়ে পুলিশের লাঠির ঘা খেয়ে খোঁড়াচ্ছে। বললেন, “সন্ধ্যা থেকেই উচ্ছেদের প্রাথমিক প্রস্তুতি পুরোদমে শুরু হয়। আমরা রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ এসে দেখি পরিবেশ উত্তেজনাময়। রাত গভীর হলে পুলিশ লাঠি চালায়।”

দখল করা জমির নানা অংশে বিভিন্ন দেবদেবীর ছোট-বড় মন্দির। সেগুলো রয়ে গিয়েছে। রিক্সাচালকদের সংগঠনের অফিস ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে চিন্তান্বিত ৩-৪জন রিক্সাওয়ালা। এই প্রতিবেদকের কাছে ওঁরা স্বীকার করলেন, সর্বত্র দখলের মাত্রা বাড়তে বাড়তে যে জায়গায় চলে গিয়েছে, না উচ্ছেদ করে উপায় ছিল না!”

রেলের দখল করা জমির ঠিক বিপরীতে রাস্তার পাশে সারি সারি ফ্ল্যাট। সেরকমই একটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা রহিত দত্ত (নাম পরিবর্তিত) এই প্রতিবেদককে বললেন, “ওই ফ্ল্যাটের বারান্দায় এলেই নিত্য সহ্য করতে হত দৃশ্যদূষণ। ট্রেন এলে এতো লোক প্ল্যাটফর্ম থেকে এবরো-খেবরো পথে নামেন যে কেউ কোনও সময় পড়ে যেতে পারেন। পদপিষ্ট হয়ে মারা গেলে তখন সবাই দুষবে রেলকে। রিক্সা এবং অটো ধরার সংলগ্ন অপরিসর পথও অগম্য। প্রতি পরতে অতি নিকৃষ্ট মানের জীবনযাত্রার ছাপ। রেল এই গোটা অংশে যদি পরিবেশবান্ধব সৌন্দর্যায়ন করে, তা অবশ্যই ভালো হবে।”

রাতে ঘটনাস্থলে এসে একবার পরিস্থিতি দেখে গিয়েছিলেন অমিত ভৌমিক। গাড়ির মেকানিক। কাছেই বাড়ি। সোমবার বাইকে করে সাতসকালে আর একবার এসেছেন পরিস্থিতি দেখতে। এই প্রতিবেদককে বললেন, “খুশি হয়েছি। এই দখলদারদের অনেকেই সম্পন্ন। মানুষের আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে, রাজনৈতিক মদতে ভেবেছিলেন সারা জীবন সরকারি জমি দখল করে রাখতে পারবেন। রাজ্যের নয়া সরকারকে ধন্যবাদ।”

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, গাড়ি এবং ট্রেন চলাচলের স্বার্থে গত শতকের আশির দশকের প্রথমার্ধে পরিকল্পনা হয়েছিল যাদবপুরে রেলসেতু তৈরির। কিন্তু দখলদার উচ্ছেদে বাধা, আইনি জটিলতা প্রভৃতি নানা কারণে তার রূপায়ণ করা যাচ্ছিল না। ছিল সেতুর ঢাল তৈরির পর্যাপ্ত জায়গার অভাবও।

স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে কয়েক দশক আগে সংলগ্ন লেভেল ক্রশিংয়ের বিভীষিকা আজও এই প্রতিবেদকের চোখের সামনে ভাসে। রেলগেট ফেলতে না পারায় প্রায়শই ট্রেন এসে লাইনের ওপর থমকে যেত। ওই ট্রেনযাত্রীদের মতোই দিনের পর দিন ভুগতে হয়েছে রেলগেটের দু’পাশে অপেক্ষমান যাত্রীদের। আশির দশকের দ্বিতীয় অর্ধে মূলত এলাকার তৎকালীন সিপিএম নেতা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কিছু অংশ দখলমুক্ত করে কাজ শুরু হল। ১৯৯২-এ সন্তোষপুর থেকে যাদবপুরের রাজা সুবোধ মল্লিক রোডে যাতায়তের জন্য সংলগ্ন রেল স্টেশনের উপর দিয়ে সেতু তৈরি করা হয়।

প্রথম থেকেই এই সেতুটির তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল রাজ্যের পূর্ত দফতর। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু এই সেতুর উদ্বোধন করেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের নামে সেতুটির নামকরণ করা হয়। সংলগ্ন তৎকালীন যাদবপুর টিবি হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর স্মৃতিতে ওই নামকরণ।

এর পর যাদবপুরে রেলের প্লাটফর্ম এবং জমি ক্রমেই বেশিমাত্রায় দখল হতে থাকে। রাজনৈতিক মদতপুষ্ট দখলদারদের হঠানোর ক্ষমতা ছিল না রেলের। হঠাতে গেলে বাধার মুখে পড়েছেন রেলকর্মীরা। প্রহৃত হরেছেন। রেল অবরোধ হয়েছে। রবিবার রাতে সেখানে তৈরি হ’ল নয়া ইতিহাস।


Recent Comments