অশোক সেনগুপ্ত
“১৯৫১ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যখন সংসদে প্রথম সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ করেন তখন সে’সময়কার অঘোষিত বিরোধী দলনেতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব ১৬ দিন ধরে চলেছিল বিতর্ক। ডঃ মুখোপাধ্যায়ের অনুযোগ ছিল পন্ডিত নেহেরু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির চেয়ে স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে কাজ করছেন। সে’সময়ে সংসদে দাঁড়িয়ে পন্ডিত নেহেরুকে হেন আক্রমণ করার সাহস বোধহয় কারোর ছিলো না।” বুধবার ডায়মন্ডহারবারের ফকির চাঁদ কলেজে শ্যামাপ্রসাদ স্মরণে এক আলোচনাচক্রে অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ প্রবাল রায় চৌধুরী। প্রবালবাবু বলেন, ‘ইউ আর ট্রিটিং দ্যা কনস্টিটিউশন অ্যাজ এ স্ক্র্যাপ অফ পেপার’— নেহরুকে লক্ষ্য করে এমন শানিত মন্তব্য করতেও দ্বিধাবোধ করেননি শ্যামাপ্রসাদ।

নেহেরু-সুভাষচন্দ্রের মতানৈক্য বা ভিন্ন মতের কথা নানা সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে। প্রবালবাবু এদিন তাঁর ভাষণে বলেন, সুভাষচন্দ্র বসু’র জন্ম ১৮৯৭-এ। শ্যামাপ্রসাদের জন্ম ১৯০১-এ। দুজনই ছিলেন সমকালীন বঙ্গ রাজনীতির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৪৪ সালে সুভাষচন্দ্র বিদেশের মাটিতে আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে ব্যস্ত। সেই সময়কালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন, সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে আমার কোনও ক্ষোভ নেই। বরং, তাঁর প্রতি রয়েছে শ্রদ্ধা ও ভক্তি।
ডঃ রায় চৌধুরী বলেন, “ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস লিখতে শুরু করে বাধা পেয়েছিলেন। পরে স্বউদ্যোগে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করেন তিন খণ্ডের সংকলনে। কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার সাত খণ্ডে লেখে বিষয়টি। তার মূল উপপাদ্য ভারত স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়ী হয়েছে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে।আন্দোলনের নানা স্তরে সুভাসচন্দ্র বসু, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-সহ বাংলার বিপ্লবীদের অবদান ওই সংকলনে সঠিকভাবে স্বীকৃতি পায়নি।
ইংরেজ শাসন যখন তুঙ্গে, সে সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে বলদর্পী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একথা জানিয়ে ডঃ রায় চৌধুরী বলেন, “শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন লোগো চালু করেন। ভারতীয়করণের পরিচয় দেন।”

পরাধীন ভারতের সাবেক বিভিন্ন প্রদেশের পর্যায়ক্রমে স্বাধীন ভারতে অন্তর্ভূক্তিকরণের সময় কাশ্মীরকে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়। এর উল্লেখ করে ডঃ রায় চৌধুরী বলেন, সংবিধানের ৩৭০ ধারাবলে ওই বিশেষ অধিকারের প্রতিবাদ করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বলেছিলেন, এক দেশে দুই পতাকা, দুই সংবিধান চলবে না। বহু যুগ বাদে সেই শ্যামাপ্রসাদের সেই দাবি আজ মান্যতা পেয়েছে।

আলোচনায় স্বাগত ভাষণে কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ সোমেন চন্দ বলেন, যে কোনও কারণেই হোক, এতদিন আমরা সেভাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে চর্চা করিনি। অনেকেরই তাঁর সম্পর্কে বা পশ্চিমবঙ্গ গঠনে তাঁর অবদান সম্পর্কে বিশদ তথ্য জানিনা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালি যুগে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান, ভারতে পশ্চিমবঙ্গ ও কাশ্মীরের অন্তর্ভূক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদের অবদানের কথা উল্লেখ করেন ডঃ চন্দ। আলোচনায় আমন্ত্রিত আলোচক হিসাবে বক্তব্য রাখেন লেখক-সাংবাদিক অশোক সেনগুপ্ত।
অনুষ্ঠানের শুরু ও শেষে পরিবেশিত হয় যথাক্রমে ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘জনগণমনঅধিনায়ক’। আহ্বাণ ও সংযোজনার দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে ডঃ লোপামুদ্রা পাল ও ডঃ দেবদত্তা ব্যানার্জী।

প্রসঙ্গত, ২৩ জুন থেকে ৬ জুলাই সরকারের আবেদনে সারা দিয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্মরণে বিভিন্ন জায়গায়, মূলত নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠান হচ্ছে। তাতে ভাষণ দিচ্ছেন বিভিন্ন স্তরের বক্তা। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫ বছর উপলক্ষে বর্ষব্যাপী উদযাপনের আয়োজন।


Recent Comments