সম্প্রতি ইরান (Iran) এবং ইসরায়েল (Israel)-এর মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাত এবং তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) যৌথভাবে এই সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু এই চূড়ান্ত ডামাডোলের মধ্যে হোয়াইট হাউস (White House)-এর অন্দরে এক অদ্ভুত নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর এই নীরবতার কেন্দ্রে রয়েছেন খোদ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (J.D. Vance)। যুদ্ধের মতো একটি জাতীয় সংকটের মুহূর্তে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তির এই রহস্যময় অন্তর্ধান এবং মিডিয়া এড়িয়ে চলার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলে কান পাতলেই এখন একটাই গুঞ্জন— তবে কি ট্রাম্প এবং ভ্যান্সের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে?
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক সপ্তাহ আগে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানি সামরিক এবং পারমাণবিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা শুরু করে। ওয়াশিংটন (Washington)-এর অন্যান্য শীর্ষ আধিকারিকরা যখন এই অভিযানের সমর্থনে একের পর এক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, তখন প্রথম ৭২ ঘণ্টা ভ্যান্স কার্যত লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি আসেননি, এমনকি নিজের সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই নিয়ে কোনো জোরালো মন্তব্য করা থেকে বিরত ছিলেন।
এই গুঞ্জনের আগুনে ঘি ঢেলেছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সম্প্রতি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্বীকার করে নেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার বিষয়ে তার এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের মধ্যে “দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা পার্থক্য” রয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই জানান যে, এই সামরিক অভিযানে যাওয়ার ব্যাপারে ভ্যান্স খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না। যদিও ট্রাম্পের দাবি, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে আমেরিকার কাছে আক্রমণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প খোলা ছিল না। কিন্তু প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্টের এই ধরনের মন্তব্য বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, প্রশাসনের অন্দরে সবকিছু খুব একটা স্বাভাবিক ছন্দে চলছে না।
জেডি ভ্যান্সের এই যুদ্ধ-বিরোধী অবস্থানের পেছনে তার নিজস্ব অতীত অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক আদর্শ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। একসময় তিনি মার্কিন মেরিন কর্পসের হয়ে ইরাক (Iraq) যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সামরিক জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাই তাকে পরবর্তীকালে কট্টর যুদ্ধ-বিরোধী বা ‘অ্যান্টি-ইন্টারভেনশনিস্ট’ করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্য (Middle East)-এর মতো জটিল অঞ্চলে আমেরিকার অকারণে জড়িয়ে পড়ার তিনি বরাবরই কড়া সমালোচক। বিগত নির্বাচনী প্রচারণাতেও তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, বিদেশের মাটিতে আমেরিকার অন্তহীন যুদ্ধ মার্কিন করদাতাদের জন্য এক বিরাট বোঝা। তার রাজনৈতিক উত্থানই হয়েছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ওপর ভিত্তি করে, যেখানে দেশের ভেতরের সমস্যা সমাধানই প্রধান লক্ষ্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জেডি ভ্যান্স চাইছেন না যে আমেরিকা পুনরায় কোনো “ফরএভার ওয়ার” বা অন্তহীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। এর আগে আফগানিস্তান ও ইরাকের ক্ষেত্রে যা হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি তিনি দেখতে চান না। হোয়াইট হাউসের কিছু অভ্যন্তরীণ সূত্র দাবি করছে যে, পর্দার আড়ালে থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছেন যাতে এই সামরিক অভিযান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং স্বল্পমেয়াদী হয়। তিনি চান শুধুমাত্র ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নষ্ট করেই যেন মার্কিন সেনারা ফিরে আসে, কোনোভাবেই যেন সেখানে সরকার পরিবর্তনের মতো দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল খেলায় আমেরিকা না জড়ায়। তার এই অবস্থান একদিকে যেমন তার নীতিগত সততা প্রমাণ করে, তেমনি আবার তাকে প্রশাসনের অন্যান্য যুদ্ধবাজ নেতাদের চোখের বালিতেও পরিণত করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, নিজের এই রাজনৈতিক আদর্শ বজায় রাখতে গিয়েই কি তিনি প্রশাসনের বর্তমান রণনীতির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারছেন না? সম্প্রতি যখন সাংবাদিকরা তাকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এই মতবিরোধ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেন, তখন তিনি অত্যন্ত কৌশলে উত্তর এড়িয়ে যান। ভ্যান্স জানান যে, “প্রেসিডেন্ট তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে কী আলোচনা করছেন, তা বাইরে এসে ফাঁস করে দেওয়াটা কোনো দায়িত্বশীল কাজ নয়।” তিনি এইটুকু বলেই থেমে যান, কিন্তু মতবিরোধের জল্পনাটি একবারের জন্যও সরাসরি অস্বীকার করেননি। এদিকে এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই ফায়দা লুটছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (Marco Rubio)। তিনি এই সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী এবং প্রথম থেকেই সংবাদমাধ্যমের সামনে এই পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে আসছেন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে ভ্যান্সের পাশাপাশি রুবিও-ও একজন বড় দাবিদার। ফলে, বর্তমান সংকটে ভ্যান্সের এই ‘ব্যাকফুটে’ থাকাটা রুবিওর জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।


Recent Comments