আসন্ন নির্বাচনের আগে ফের একবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) তথা শহরের রাজ্য রাজনীতি। শনিবার উত্তর কলকাতার (North Kolkata) গিরিশ পার্ক (Girish Park) এলাকায় ভারতীয় জনতা পার্টির (Bharatiya Janata Party) কর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় পুলিশের নিস্ক্রিয়তা এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর (Central Armed Police Forces – CAPF) অনুপস্থিতি নিয়ে এবার সরাসরি ভারতের নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) দ্বারস্থ হল বঙ্গ বিজেপি। ১৫ মার্চ, রবিবার, বিজেপি নেতা শিশির বাজোরিয়া (Shishir Bajoria) মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে একটি কড়া চিঠি পাঠিয়েছেন, যেখানে তিনি কলকাতা পুলিশের (Kolkata Police) বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন।
ঠিক কী ঘটেছিল ১৪ মার্চ?
চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৪ মার্চ কলকাতার বুকে এক চরম বিশৃঙ্খল ও ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) একটি মেগা র্যালি ছিল ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে (Brigade Parade Ground)। সেই সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা বাসে করে আসছিলেন। অভিযোগ, গিরিশ পার্ক এলাকার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকাই বেশ কয়েকটি বাসের ওপর ব্যাপক ইটবৃষ্টি এবং প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়। এই নজিরবিহীন হিংসার জেরে বাসের কাঁচ ভেঙে যায় এবং বহু সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে গেরুয়া শিবিরের নেতারা গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক হয়ে পড়ে যে, বেশ কয়েকজনকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় চিকিৎসার জন্য।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ
বিজেপির মূল ক্ষোভের জায়গাটি হল আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি এবং পুলিশ প্রশাসনের সন্দেহজনক ভূমিকা। বাজোরিয়ার দেওয়া চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, শহরে আগে থেকেই বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, যখন গিরিশ পার্কের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকায় এত বড় একটি অশান্তি ঘটল, তখন ঘটনাস্থলে বা তার আশেপাশে কোথাও জওয়ানদের দেখা যায়নি।
গেরুয়া শিবিরের দাবি, পুলিশের কাছে এই সম্ভাব্য হিংসা বা হামলার বিষয়ে আগে থেকেই আগাম গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল। তা সত্ত্বেও তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল এবং শুধুমাত্র নিজেদের হাতে দায়িত্ব রেখেছিল। একে রাজ্য পুলিশের চরম গাফিলতি এবং বাহিনীর ‘অপব্যবহার’ বলে তোপ দেগেছে তারা।
কমিশনের কাছে পূর্ব সতর্কবার্তা
এই ঘটনা যেন হঠাৎ করে ঘটা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, তা বোঝাতে চিঠিতে পুরনো একটি বৈঠকের অবতারণা করা হয়েছে। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, গত ৯ মার্চ বিজেপির একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করেছিল। সেখানে তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন যে, স্পর্শকাতর বা উত্তেজনাপ্রবণ এলাকাগুলিতে ভোটারদের মনে সাহস জোগানোর বদলে, জওয়ানদের শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ এলাকায় এবং হাইওয়েতে রুট মার্চ করানো হচ্ছে। গতকালের গিরিশ পার্কের ঘটনাই প্রমাণ করে দিচ্ছে যে বিজেপির সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
কী দাবি বিজেপির?
চিঠির শেষে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে কড়া পদক্ষেপের আর্জি জানিয়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁরা আবেদন করেছেন, যে বা যাঁরা এই বাহিনীকে সঠিক সময়ে মোতায়েন না করার পেছনে দায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে যেন কঠোরতম আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি, আগামী দিনগুলোতে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত যাতে জওয়ানদের সঠিকভাবে এরিয়া ডমিনেশন এবং সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ফেরানোর কাজে ব্যবহার করা হয়, তা সুনিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক তরজা ও সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠা
ভোটের ঠিক মুখে শহরের প্রাণকেন্দ্রে এহেন হিংসার ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক পারদকে একলাফে অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। আহত কর্মীদের পরিবার পরিজনদের মধ্যেও চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব হল নির্বাচন। আর সেই উৎসবের প্রাক্কালে এমন রক্তপাত এবং হিংসার ছবি কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করছেন রাজ্যের সুশীল সমাজের একাংশ। কমিশন সর্বদা ‘অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ’ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। কিন্তু খাস কলকাতার বুকে দিনে দুপুরে এমন হামলার পর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কমিশন এই চিঠির ভিত্তিতে প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো রিপোর্ট তলব করে কিনা।

Recent Comments