মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার দিকে নজর রাখছে গোটা বিশ্ব। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ—সবারই চোখ এখন পেট্রোল, ডিজেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের দিকে। কিন্তু এর আড়ালে যে এক ভয়ংকর বিপদ নিঃশব্দে ধেয়ে আসছে, তা অনেকেই খেয়াল করছেন না। আর সেই বিপদটি হলো চরম খাদ্য সংকট। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়ছেন। ইরান (Iran) যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় কার্যত পঙ্গু হয়ে গিয়েছে আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যবস্থা। এর ফলে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে, যা আমাদের প্লেটের খাবারের সরাসরি জোগান দেয়।
অনেকেই ভাবতে পারেন যে তেল এবং সারের মধ্যে সম্পর্ক কী! আসলে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সার হলো ইউরিয়া। আর এই ইউরিয়া তৈরি হয় অ্যামোনিয়া থেকে, যার মূল উপাদান হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। অর্থাৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস ছাড়া ইউরিয়া উৎপাদন কার্যত অসম্ভব। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৪৯ শতাংশ ইউরিয়া, ২৭ শতাংশ অ্যামোনিয়া এবং ২৪ শতাংশ ফসফেট সার পরিবাহিত হয়। এই পথটি বন্ধ থাকার অর্থ হলো, প্রায় অর্ধেক পৃথিবীর খাদ্য নিরাপত্তা খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ানো।
ভারত (India) বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সার আমদানিকারক দেশ। ব্রাজিল (Brazil) এবং আমেরিকা (USA)-এর পরেই আমাদের স্থান। শুনতে ভালো লাগলেও এটা সত্যি যে ভারত তার প্রয়োজনীয় ইউরিয়ার ৮৭ শতাংশ দেশেই উৎপাদন করে। কিন্তু সেই উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বর্তমানে সেই গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভারতের ইফকো (IFFCO)-র মতো বড় বড় ইউরিয়া কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। তারা এখন মাত্র ৬০ শতাংশ ক্ষমতায় কাজ করছে এবং হরিয়ানা (Haryana), গুজরাট (Gujarat), ঝাড়খণ্ড (Jharkhand) ও উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোর কিছু কারখানা ইতিমধ্যেই আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু ইউরিয়াই নয়, খনিজ তেল শোধনের উপজাত দ্রব্য সালফারের উৎপাদনও তলানিতে ঠেকেছে। সৌদি আরামকো (Saudi Aramco) এবং রিলায়েন্স (Reliance)-এর মতো বড় শোধনাগারগুলি তেলের অভাবে বা যুদ্ধের কারণে উৎপাদন কমালে সালফারের ঘাটতি দেখা দেয়। এই সালফার শুধু সার উৎপাদনেই নয়, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পেও ব্যবহৃত হয়। ফলে খাদ্য সংকটের পাশাপাশি ওষুধ এবং চিপের বাজারেও বড়সড় ধাক্কা আসতে চলেছে।
সামনেই জুন মাস, কৃষকদের খরিফ শস্য বোনার মূল সময়। মে-জুন মাস পর্যন্ত যদি এই সারের ঘাটতি বজায় থাকে, তবে কৃষকরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। পর্যাপ্ত সার না পেলে ফসলের উৎপাদন বিপুল পরিমাণে কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দামের ওপর। আমাদের মতো দেশে, যেখানে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ এখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই সংকট এক জাতীয় বিপর্যয়ের আকার নিতে পারে। এছাড়া সরকারের ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকার সার ভর্তুকির বাজেটও প্রবল চাপের মুখে পড়বে, যার পরোক্ষ বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের ঘাড়েই এসে পড়বে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন (Russia-Ukraine) যুদ্ধের সময়ও বিশ্ব এমন এক সার সংকটের সাক্ষী হয়েছিল। সেবার শ্রীলঙ্কার মতো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল এবং বিশ্বের বহু জায়গায় খাবারের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এবারের পরিস্থিতি তার চেয়েও বহুগুণ ভয়ানক হতে পারে। ধনী দেশগুলোতে হয়তো শুধু খাবারের দাম বাড়বে, কিন্তু সুদান (Sudan) বা সোমালিয়া (Somalia)-র মতো গরিব দেশগুলোতে দেখা দেবে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।
যুদ্ধ হয়তো একদিন থেমে যাবে, কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো আবার চালু করে সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়। তেলের দাম বাড়লে আমরা পরের দিনই বুঝতে পারি, কিন্তু সারের অভাবের প্রভাব বুঝতে ৫-৬ মাস সময় লাগে—যখন মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাই সময় থাকতে যদি বিশ্বনেতারা এই সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেন, তবে অচিরেই আমাদের রান্নাঘরগুলোতে এই যুদ্ধের চরম আঁচ এসে লাগবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

Recent Comments