পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে গোটা মধ্যপ্রাচ্য (Middle East) এক সর্বনাশা যুদ্ধের আগুনে ভস্মীভূত হতে পারে। আর এই আশঙ্কাই ক্রমশ সত্যি হওয়ার পথে। এবার যুক্তরাষ্ট্র (United States) এবং ইজরায়েলের (Israel) বিরুদ্ধে একযোগে নিজেদের পাল্টা হামলার তীব্রতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি করছে ইরান (Iran)। গত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে যেভাবে মার্কিন এবং ইজরায়েলি লক্ষ্যবস্তুগুলিকে নিশানা করা হচ্ছে, তাতে আন্তর্জাতিক মহলে ঘোর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা বা সতর্কবার্তায় যে তেহরান (Tehran) বিন্দুমাত্র কান দিতে নারাজ, তাদের সাম্প্রতিক আক্রমণাত্মক কৌশল থেকেই তা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।
ছায়াযুদ্ধের নয়া ব্লু-প্রিন্ট
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের প্রক্সি বা মদতপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে কাজে লাগাচ্ছে। ইরাক (Iraq) এবং সিরিয়ায় (Syria) অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলি গত কয়েক সপ্তাহে একাধিকবার মারাত্মক ড্রোন এবং রকেট হামলার শিকার হয়েছে। এই হামলাগুলির পিছনে সরাসরি গাজা সংঘাতের জেরে তৈরি হওয়া ক্ষোভ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ইরানের সুপরিকল্পিত ইন্ধন। লেবাননের (Lebanon) শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ (Hezbollah) এবং ইয়েমেনের (Yemen) হুথি (Houthis) বিদ্রোহীরাও এই সংঘাতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ইজরায়েলের উত্তর সীমান্তে হিজবুল্লাহর লাগাতার রকেট বর্ষণ পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে।
মার্কিন স্বার্থে লাগাতার আঘাত
পেন্টাগন সূত্রে খবর, শুধু সিরিয়া বা ইরাক নয়, জর্ডন বা লোহিত সাগরের বুকেও মার্কিন স্বার্থের ওপর জোরালো আঘাত হানার চেষ্টা চলছে। হুথিরা বাণিজ্যিক জাহাজের পাশাপাশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলিকেও নিশানা করছে অবলীলায়। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ কার্যত অবরুদ্ধ হওয়ার জোগাড় হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রশাসন এই ধারাবাহিক হামলার কড়া সমালোচনা করেছে এবং বেশ কয়েকবার সামরিক প্রত্যাঘাতও করেছে। কিন্তু তাতে দমে যাওয়ার বদলে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলি যেন আরও বেশি বেপরোয়া ও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, গাজায় ইজরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ না হলে এই অঞ্চলে আমেরিকা ও ইজরায়েল কোথাও শান্তিতে ঘুমোতে পারবে না।
ত্রিমুখী চাপে ইজরায়েল
অন্যদিকে, ইজরায়েলকে এখন একইসঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে লড়তে হচ্ছে। দক্ষিণে হামাস, উত্তরে হিজবুল্লাহ এবং দূর থেকে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলির মিসাইল— সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব নিরাপত্তা সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার। ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী যদিও দাবি করছে যে তারা যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী এই যুদ্ধ তাদের অর্থনীতি এবং সামরিক কাঠামোর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। ইরানের এই কৌশল ইজরায়েলকে ভিতর থেকে একটু একটু করে দুর্বল করার এক নিখুঁত চাল বলেই মনে করছেন সমরকৌশলবিদরা।
কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ইরানের এই নয়া কৌশলের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক প্রবল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। তেহরান সরাসরি নিজে ময়দানে অবতীর্ণ না হয়েও, প্রতিপক্ষকে সবসময় এক মারাত্মক স্নায়ুবিক চাপের মধ্যে রাখছে। ওয়াশিংটন (Washington) এবং তেল আভিভের (Tel Aviv) শীর্ষ নেতৃত্ব বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন যে, তাঁদের একটি ছোট ভুল পদক্ষেপও গোটা অঞ্চলে পরমাণু যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। রাশিয়া (Russia) এবং চিনের (China) মতো দেশগুলি এই চরম ডামাডোলের মধ্যে ইরানের পাশেই প্রচ্ছন্নভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। ফলে রাষ্ট্রসংঘের (United Nations) নিরাপত্তা পরিষদেও এই বিষয়ে কোনও সর্বসম্মত কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।


Recent Comments