নিত্যদিনের মতোই শান্ত একটি সকাল। মাঠে ঘাটে নিজেদের দৈনন্দিন কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। কিন্তু আচমকাই আকাশ থেকে খসে পড়ল অদ্ভুত দর্শন এক বস্তু! দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন আস্ত একটি বিমান ভেঙে পড়েছে ধানখেতে। আর এই অপ্রত্যাশিত দৃশ্য ঘিরেই সাতসকালে তীব্র চাঞ্চল্য এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-এর পশ্চিম মেদিনীপুর (Paschim Medinipur) জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে।
ঘটনাটি ঘটেছে জেলার দাঁতন (Dantan) থানার অন্তর্গত দাঁতন-১ ব্লক (Dantan-1 Block)-এর শরশঙ্কা (Sharshanka) সংলগ্ন বকুলতলা (Bakultala)-র কাজুচক (Kajuchak) এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে খবর, বুধবার সকালে গ্রামের কৃষকরা যখন খেতের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁরা ওই অদ্ভুত বস্তুটি ধানজমির ওপর পড়ে থাকতে দেখেন। জিনিসটি দেখতে হুবহু একটি এরোপ্লেনের মতো, তবে আকারে বেশ ছোট বা মিনিয়েচার গোছের। এই ধরনের একটি জিনিস হঠাৎ করে কোথা থেকে উড়ে এল বা কীভাবে পড়ল, তা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয় গ্রামবাসীদের মধ্যে। অনেকেই প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বুঝতে পারেন এটি সম্ভবত একটি অত্যাধুনিক ড্রোন (Drone)।
প্রসঙ্গত, সদ্যই দেশজুড়ে আসন্ন নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়েছে। ভোটের আবহে চারদিকে কড়া নিরাপত্তা ও নজরদারি চলছে। নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে প্রতিটি জেলায় কড়া নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। এই রকম একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও উত্তপ্ত সময়ে গ্রামের নির্জন মাঠে এহেন অজানা ‘উড়ন্ত’ বস্তুর পতন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে গভীর আশঙ্কার জন্ম দেয়। গ্রামবাসীদের মনে প্রশ্ন জাগে, এটি কি নিছকই কোনো সাধারণ খেলনা, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে কোনো বড়সড় নাশকতার বা গুপ্তচরবৃত্তির ছক?
স্থানীয় এক আতঙ্কিত বাসিন্দা আমাদের জানান, “সকালে ধানজমির উপরে এটাকে কয়েকজন পড়ে থাকতে দেখেন। দূর থেকে দেখতে একেবারে সাধারণ প্লেনের মতো লাগছিল। কাছে গিয়ে মনে হলো অনেকটা খেলনা প্লেনের মতো। কিন্তু ওর ভিতরে কোনো বিস্ফোরক, বোমা বা বিপজ্জনক কিছু রাখা আছে কি না, তা নিয়ে আমাদের মনে তীব্র সন্দেহ তৈরি হয়। বিস্ফোরণের ভয়ে কেউ আর ওই জিনিসের কাছে ঘেঁষতে সাহস পায়নি।”
খবর চাউর হতেই দাবানলের মতো গোটা গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই বস্তুটিকে এক ঝলক দেখার জন্য খেতের আশেপাশে ভিড় জমাতে শুরু করেন বাচ্চা থেকে বুড়ো সকলেই। পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই হাতের বাইরে না যায় বা কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সেই কারণে অবিলম্বে খবর দেওয়া হয় স্থানীয় থানায়। ঘটনার খবর পেয়ে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন দাঁতন থানার পুলিশ আধিকারিকরা। পুলিশ এসে প্রথমেই গোটা ধানজমিটিকে কর্ডন করে বা ঘিরে ফেলে এবং কৌতূহলী সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেয়। এরপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বস্তুটিকে পরীক্ষা করে উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীকালে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে যে স্বস্তিদায়ক তথ্য উঠে আসে, তা শুনে কার্যত হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন গ্রামবাসীরা। দাঁতন থানার আইসি (IC) বিশ্বজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (Biswajit Bandyopadhyay) গোটা বিষয়টি খোলসা করে জানান। তিনি বলেন, “উদ্ধার হওয়া ওই ড্রোনটি আসলে ইন্ডিয়ান অয়েল (Indian Oil)-এর। ওই এলাকায় তাদের মাটির তলার পাইপ লাইনের কাজ চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। সেই কাজের ওপর আকাশপথে নজরদারি চালানোর জন্যই ওই ড্রোনটি ওড়ানো হয়েছিল। কিন্তু ওড়ার সময় কোনো কারণে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয় এবং রিমোটের সঙ্গে সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন হয়ে সেটি সোজা নিচে খেতের মধ্যে পড়ে যায়। এখানে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি।”
পুলিশের এই স্পষ্ট বার্তার পরেই অবশেষে স্বস্তির শ্বাস ফেলেন কাজুচক ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সকল বাসিন্দারা। সকাল থেকে যে টানটান উত্তেজনা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা নিমেষেই শান্ত হয়ে যায়। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে অনেক সময় নিত্যনতুন যন্ত্রপাতি বা গ্যাজেট সাধারণ মানুষের মনে কীভাবে বিভ্রান্তি এবং অকারণে ভয়ের সৃষ্টি করতে পারে, দাঁতনের এই ঘটনাটি তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকল।

Recent Comments