নির্বাচন মানেই এতদিন মুর্শিদাবাদে হিংসা, রক্তপাত এবং আতঙ্কের ছায়া—এই ছিল চেনা ছবি। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিল। জেলার ২২টি বিধানসভা কেন্দ্রে এ বার শান্তিপূর্ণ, অবাধ এবং রক্তপাতহীন ভোটগ্রহণ হয়েছে। কোথাও বড় ধরনের সংঘর্ষ বা প্রাণহানির খবর মেলেনি।
সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ভোটদানের হার পৌঁছেছে প্রায় ৯২ শতাংশে, যা স্বাধীনতার পর এই জেলার সর্বোচ্চ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক মহলের মতে, শুধু জেলা নয়, গোটা দেশেই এটি এক বিরল নজির।ঐতিহাসিক গুরুত্বে ভরপুর মুর্শিদাবাদ—পলাশীর যুদ্ধ, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় এবং ব্রিটিশ শাসনের সূচনার সাক্ষী এই জেলা। একসময় বাংলার নবাবদের রাজধানী হওয়ায় এখানকার রাজনৈতিক গুরুত্ব বরাবরই আলাদা।
তাই নির্বাচন মানেই থাকত বাড়তি উত্তেজনা। তবে এবারের ভোটে উত্তেজনা থাকলেও হিংসার কোনও ছাপ দেখা যায়নি।এই রেকর্ড ভোটের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। ভিনরাজ্য থেকে বহু মানুষ বাড়ি ফিরে এসে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা ভোটের শতাংশ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।গত দুই দশকের পরিসংখ্যান বলছে, মুর্শিদাবাদে ভোটদানের হার বরাবরই উল্লেখযোগ্য।
২০০১ সালে প্রায় ৭৫ শতাংশ, ২০০৬ সালে ৮০ শতাংশ, ২০১১ সালে প্রায় ৮৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এরপর ২০১৬ ও ২০২১ সালেও তা ৮২ শতাংশের আশেপাশেই ছিল।তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, অতীতে ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠত—মৃত ভোটার, ভুয়ো নাম, বুথ দখল বা ছায়া ভোটের অভিযোগ ছিল। এবারে নির্বাচন কমিশনের স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ায় ভুয়ো ও মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছায়া ভোটের সুযোগও কমেছে।
ফলে এই ৯২ শতাংশ ভোট আরও তাৎপর্যপূর্ণ।অতীতে এই জেলায় ভোটকে কেন্দ্র করে একাধিক হিংসার নজির রয়েছে। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ডোমকল-সহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষে প্রাণহানির অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনেও মৃত্যু হয়েছে কয়েকজনের। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও গুলি চালানোর অভিযোগ সামনে আসে।সেই ভয়াবহ অতীতকে পিছনে ফেলে এবার সম্পূর্ণ মৃত্যুশূন্য ও শান্তিপূর্ণ ভোটে নতুন ইতিহাস গড়ল মুর্শিদাবাদ। নির্বাচন কমিশনের কড়া পদক্ষেপে খুশি সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক দল—সবাই।

Recent Comments