২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন এবং অন্যান্যরা ৭টি। কিন্তু এই স্পষ্ট জনাদেশের পরেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না।মুখ্যমন্ত্রীর এই অবস্থানে রাজ্যে এক গভীর সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সংবিধান এবং প্রচলিত গণতান্ত্রিক রীতি কী বলে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী যে সমস্ত পদক্ষেপ গুলো নেওয়া যায় তা হল-
১)বর্তমান বিধানসভা ভেঙে গেছে কিন্তু নতুন সরকার এখনও গঠিত হয়নি। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার কেবল ‘কেয়ারটেকার’ বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করবে।
২)সংবিধানের ১৬৩ ও ১৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাজ্যপাল (গভর্নর) সংখ্যাগরিষ্ঠ দল অর্থাৎ বিজেপির নেতাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন।
৩) বিজেপি নেতা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন।
৪)নতুন বিধানসভা বসার পর অনুচ্ছেদ ১৭৪ অনুযায়ী আস্থাভোট বা ‘ফ্লোর টেস্ট’ হবে। সেখানে নবনির্বাচিত বিধায়করা অংশগ্রহণ করবেন।
৫)আস্থাভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণিত হলেই নতুন সরকার পূর্ণ বৈধতা পাবে।
কিন্তু এখনো প্রশ্ন থেকে যায়, যদি মুখ্যমন্ত্রী স্বইচ্ছায় পদত্যাগ না করেন তবে? সেক্ষেত্রে সংবিধান রাজ্যপালকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করেন।
মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ না করলে অপেক্ষা না করে সরাসরি তিনি নতুন মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে পুরনো সরকার অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং যদি কোন সাংবিধানিক নিয়ম লঙ্ঘন হয় তবে সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি হস্তক্ষেপে সুযোগ আছে।
মূল নীতি অনুযায়ী, গণতন্ত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠতাই বৈধতার একমাত্র মাপকাঠি। সেক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী সংখ্যা গরিষ্ঠতা হারালে ওই পদে তিনি আর থাকতে পারেন না এবং নির্বাচনের পর স্পষ্ট জরদের থাকলে তা অমান্য করা নৈতিকতার বিরুদ্ধে।
এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় অতীতে ভারতের বিচার বিভাগ বেশ কিছু ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে:
১)S.R. Bommai vs Union of India (১৯৯৪): সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণ হবে কেবল বিধানসভার মেঝেই (Floor Test)।
২) Nabam Rebia vs Deputy Speaker (২০১৬): এই রায়ে বলা হয়, গভর্নর স্বেচ্ছচারী নন, তবে তিনি ফ্লোর টেস্টের নির্দেশ দিতে পারেন।
এছাড়াও সংবিধানের ১৬৩ (গভর্নরের সহায়তা ও পরামর্শ), ১৬৪ (মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ), ১৭৪ (বিধানসভা আহ্বান) এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে ৩৫৬ (রাষ্ট্রপতি শাসন) অনুচ্ছেদগুলি এই সংকটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্রের সংখগরিষ্ঠতায় বৈধতার একমাত্র মাপকাঠি।শেষ পর্যন্ত জনাদেশের প্রতি শ্রদ্ধাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে এবং সংবিধানকে কার্যকর রাখবে—এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।


Recent Comments