রাজ্য রাজনীতির আঙিনায় ফের একবার উত্তেজনার পারদ চড়ল। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পর্যালোচনা সভায় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেকটা দেরিতে কাজ শুরু হওয়া এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তিনি শুধু স্থানীয় প্রশাসনকেই তুলোধোনা করেননি, পাশাপাশি এই ঘটনার জন্য প্রধান বিরোধী দল বিজেপি-র (BJP) দিকেও সরাসরি আঙুল তুলেছেন। নিউজস্কোপ বাংলার এই বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই সভার বিস্তারিত রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক চালচিত্র।
ঘটনার সূত্রপাত হয় কলকাতার (Kolkata) অদূরে আয়োজিত একটি মেগা প্রশাসনিক বৈঠক ঘিরে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রীর সেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং সময়মতোই তিনি সভাস্থলে উপস্থিত হন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, সভার প্রস্তুতির চরম অভাব। অনেক শীর্ষ আধিকারিক, এমনকি জেলার পদস্থ পুলিশ কর্তারাও তখনও নিজেদের আসনে এসে পৌঁছাননি। এই দৃশ্য দেখে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সরাসরি মঞ্চ থেকে মাইক হাতে নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের, বিশেষ করে হাওড়া (Howrah) এবং মেদিনীপুর (Medinipur) থেকে আগত আধিকারিকদের কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করেন।
রাজ্য সরকারের একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, যেমন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ (Lakshmir Bhandar), ‘স্বাস্থ্য সাথী’ (Swasthya Sathi) এবং ‘কন্যাশ্রী’ (Kanyashree) নিয়ে এই সভায় বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক এই ঢিলেমির কারণে সভার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। মুখ্যমন্ত্রী আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, “এই যে আপনারা দেরি করছেন, এর ফলে সাধারণ মানুষের কত কাজের ক্ষতি হচ্ছে আপনারা জানেন? আপনাদের বেতনের টাকা তো সাধারণ মানুষের করের টাকা থেকেই আসে। তাহলে সরকারি কাজে এতো অনীহা কেন?”
এরপরই তিনি এই অব্যবস্থাপনার জন্য সরাসরি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন। মুখ্যমন্ত্রীর নিশানায় এদিন প্রধানত ছিল ভারতীয় জনতা পার্টি। তিনি দাবি করেন যে, রাজ্যে একটি অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য এবং রাজ্য সরকারকে সাধারণ মানুষের চোখে বদনাম করার জন্য বিরোধী দল প্রতিনিয়ত চক্রান্ত করে চলেছে। “কিছু আধিকারিক এখন মনে করছেন যে দিল্লির (Delhi) নেতারা বোধহয় তাদের বাঁচিয়ে দেবেন। আমি পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি, যারা রাজ্যের সুবিধা ভোগ করে বাইরের অঙ্গুলিহেলনে চলবেন, তাদের এই প্রশাসনে কোনো জায়গা নেই,” অত্যন্ত কড়া এবং ক্ষুব্ধ সুরে বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিনের সভায় উপস্থিত রাজ্যের মুখ্য সচিব (Chief Secretary) এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্তাদের মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দেন একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করার জন্য। যে সমস্ত আধিকারিকরা ঠিক সময়ে সভায় পৌঁছাননি, তাদের অবিলম্বে শো-কজ (Show-cause) নোটিশ পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয় নবান্নের (Nabanna) তরফ থেকে। জানানো হয়েছে যে, প্রশাসনকে আরও গতিশীল করতে এবং যেকোনো ধরণের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে এই ধরণের দৃষ্টান্তমূলক কড়া পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল।
সাধারণ মানুষের একাংশের মতে, প্রশাসনিক স্তরে এই ধরনের গাফিলতি সত্যিই হতাশাজনক। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সরকারি দপ্তরে নিজেদের বিভিন্ন পরিষেবা পাওয়ার আশায় ভিড় জমান। সেখানে যদি উচ্চপদস্থ আধিকারিকরাই নিজেদের দায়িত্ব পালনে এতটা উদাসীন হন, তবে নিচুতলার কর্মীদের থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। মুখ্যমন্ত্রীর আজকের এই কড়া বার্তার পর সরকারি অফিসগুলিতে কাজের গতি ফেরে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিরোধী দলগুলো যাই বলুক না কেন, প্রশাসনের কাজে স্বচ্ছতা ও সময়ানুবর্তিতা ফিরিয়ে আনতে এই ধরণের কড়া পদক্ষেপের সত্যিই প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল


Recent Comments