অশোক সেনগুপ্ত
রবিবার (২৪/৪/২০২৬) ফলতা বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে তাকিয়ে অনেকেই। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে রীতিমত আলোচিত জায়গাটির নেপথ্যে রয়েছে ইতিহাস-বানিজ্যের ভুলতে বসা নানা কথা, অনেকেই তাতে গুরুত্ব দিই না!
অবস্থান
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার ডায়মন্ড হারবারের অদূরে, হুগলি নদীর পূর্বতীরে ফলতা। কলকাতা থেকে এর দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারের মতো।

নামকরণের নেপথ্যে
এআই বলছে, “The word “falta” means lack, fault, or absence in Spanish and Portuguese. Its etymology traces back to the Vulgar Latin *fallita (failure or lack), which developed from fallitus, the past participle of the Classical Latin verb fallō (“to deceive” or “to be mistaken”). The root word fallō is highly prolific across languages. Here are a few notable derivations:
English: Directly evolved into words like fault and shares roots with fail and false. Hindi: The Hindi word fāltū (meaning excess, useless, or spare) is likely borrowed from the Portuguese falto (lacking/faulty), a close relative of falta.”

রাজনীতি
ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা ২,৩৬,৬৬৭। মোট ভোটার: ২,৩৬,৬৬৭। ভোটকেন্দ্র বা পোলিং বুথ: ২৫৭টি। আসনটি ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে একটি সাধারণ (অসংরক্ষিত) বিধানসভা কেন্দ্র। মুসলিম ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩০.৩ শতাংশ।

ফলতায় বিধানসভার প্রথম তিনটি (১৯৫১, ’৫৭ ও ’৬২) ভোটে জেতে কংগ্রেস। এর পর ’৬৭ থেকে ’৯১— প্রতিটিতে এবং ২০০৬-এ জেতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)।
২০০১, ’১১, ’১৬ ও ’২১-এ জেতে তৃণমূল। এর পর ’২৬-এ যে কত কাণ্ড হয়ে গেল ফলতায়, তা কমবেশি সবারই জানা।
ফলতা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল
এটি হল ভারত সরকারের ‘সেজ’ (‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’) প্রকল্পের ঘোষিত প্রথম ৮ টি, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম সেজ। ফলতা সেজ তৈরি হয় ১৯৮৪ সালে। এটি ২৮০ একর (১.১৪ বর্গ কিমি) জমি নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ২৩৫ একর জমিতে প্রকল্প পরিকাঠামো গঠন করা সম্পূর্ণ হয়েছে। বাকি ৪৫ একর জমিতে পরিকাঠামো গঠনের কাজ চলছে।
এখানে বিদ্যুতের নিরবছিন্ন যোগানের জন্য সাবস্টেশন গঠন করা হয়েছে। সেজ এলাকার জন্য এখানে প্রতিদিন ১ মিলিয়ন লিটার জল উৎপাদন করা হয়। শিল্প এলাকাটিতে মোট ১১ কিমি সড়ক পথ রয়েছে এবং ৫ কিমি সড়ক পথ নির্মাণের কাজ চলছে। এখানে একটি ডাকঘর ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিস গঠন করা হয়েছে।

ফলতা সেজ এর কাঁচামাল আমদানি ও রপ্তানির জন্য একটি জেটি গঠন করা হয়েছে এখানে। জেটিটি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত। এখান থেকে ২০ ফুট ও ৪০ ফুট এর কন্টেইনার জাহাজে তোলা ও নামানো হয়। ঘণ্টায় জেটিটি ৫ টি কন্টেইনার কন্ট্রল করতে পারে।
ইতিহাসের ফলতা
১৭৫৬ সালে ফলতায় আশ্রয় নেয় ইংরেজ শরণার্থীরা। ‘কংক্রিট পাপারাজ্জি’-তে দীপাঞ্জন ঘোষ জানিয়েছেন (২০২০-র ২৩ সেপ্টেম্বর), “
ব্রিটিশদের আগেই ডাচ ও পর্তুগিজরা বাংলায় এসে পড়ে। সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে এই দুটি জাতি ব্রিটিশদের চেয়ে আগে এসে আরও গভীরে প্রবেশ করেছিল। মশলার বাণিজ্যই প্রথম দিকের ইউরোপীয়দের বিশ্বের এই অংশে আকৃষ্ট করেছিল মশলা বিশেষত গোলমরিচের জন্য।

১৫৯১ সালে পর্তুগিজরা নিজেদের, জার্মান, ইতালীয় এবং স্প্যানিশদের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠা করে। কার্যকরভাবে ডাচদের সামুদ্রিক বাণিজ্য থেকে বাদ দেয়। ডাচরা পর্তুগিজদের গোপনীয় কাগজপত্র হাতে পায় যা তাদের বাণিজ্য পথ এবং ব্যবসায়িক পদ্ধতি প্রকাশ করে। ‘পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে’ প্রথম ডাচ বাণিজ্য মিশন ছিল ১৫৯৪ সালে। ৫ বছর পরে, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সাথে বাণিজ্যরত ৬টি ডাচ কোম্পানি ছিল। এই ৬টি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ১৬০২ সালের ২০ শে মার্চ একত্রিত হয়ে ইউনাইটেড ডাচ চার্টার্ড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে। এর ডাচ আদ্যক্ষর, VOC, অর্থাৎ Vereenigde Oostindische Compagnie দ্বারা বেশি পরিচিত।

১৭৫৬ সালের জুন মাসে, যখন বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ব্রিটিশদের কলকাতা বসতি থেকে তাড়িয়ে দেয়, তখন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেশ কিছু প্রতিনিধি বসতির সমস্ত নারী-শিশুদের সাথে এখানে আশ্রয় নেন। খামখেয়ালী নবাবকে ক্রুদ্ধ করতে না চেয়ে ডাচরা ইংরেজদের তাদের দুর্গে প্রবেশ করতে দেয়নি। তবে, তারা ইংরেজদের দুর্গের পাশে নোঙর করার অনুমতি দেয় এবং চিনসুরার ডাচ প্রধান অ্যাড্রিয়ান বিসডম ইংরেজদের সবরকম সাহায্য করেন।
ইংরেজরা ১৭৫৬ সালের ২৬ শে জুন ফলতায় (পুরানো নথিতে ফুলটা বানান) এসে পৌঁছায়। তারা সেই বছরের শীতকাল পর্যন্ত এখানেই থাকে। অবশেষে মাদ্রাজ (বর্তমানে চেন্নাই) এর ফোর্ট সেন্ট জর্জ থেকে একটি বিশাল নৌবহরের আকারে সাহায্য এসে পৌঁছায়। এই নৌবহরে ছিলেন ক্লাইভ। তিনি কোম্পানির বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। স্যার আয়ার কুট, ছিলেন মহামান্য রাজার ৩৯ তম পদাতিক রেজিমেন্টের কমান্ডার। এখান থেকে বাহিনীটি ১৭৫৬ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে। ১৭৫৭ সালের ২ রা জানুয়ারি কলকাতা দখল করে।

১৮২৫ সালে, ভিওসি এবং ইআইসি পূর্বে বসতিগুলির একটি পারস্পরিক বিনিময় করেছিল। ভিওসি সুমাত্রা দ্বীপে ইংরেজদের সমস্ত অধিকারের বিনিময়ে তাদের সমস্ত ভারতীয় বসতি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে। এই চুক্তির শর্তানুযায়ী, ফলতা দুর্গটি ইআইসি-র দখলে আসে।
এরপর এর কী হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়, কারণ নথিপত্র খুব কম এবং বিক্ষিপ্ত। মনে হয় যে স্বাধীনতা এবং দেশভাগের পর, নতুন ভারত সরকার দুর্গটি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহার করেছিল। দুর্গটিতে এখনও সেখানে পুনর্বাসিত উদ্বাস্তুদের কিছু পরিবার আছে। কিছু আকর্ষণীয় ধ্বংসাবশেষ রয়েছে যা এটিকে স্বতন্ত্র করে তোলে।”


Recent Comments