রাজ্য রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে চর্চিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শাসক দলের বিধায়কদের সই-কাণ্ড। তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) বিধায়কদের নাম জড়িয়ে যে চাঞ্চল্যকর সই জালিয়াতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে, এবার তার তদন্তে রীতিমতো কোমর বেঁধে ময়দানে নামল সিআইডি (CID)। ঘটনার একেবারে গভীরে পৌঁছতে এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় আরও বেশি গতি আনতে একটি পাঁচ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট (SIT) গঠন করেছে রাজ্যের এই শীর্ষ তদন্তকারী সংস্থা। এখানেই শেষ নয়, এই হাই-প্রোফাইল মামলার তদন্তে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আগামী সোমবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে অভিষেককে (Abhishek)।
নিউজস্কোপ বাংলা (Newscope Bangla)-র নিজস্ব সূত্র অনুযায়ী, সম্প্রতি সিআইডির অন্দরে একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা জারি করা হয়। আর সেই প্রশাসনিক নির্দেশিকা মেনেই দ্রুততার সঙ্গে এই পাঁচ সদস্যের সিট গঠন করা হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ কেন এমন একটি আলাদা ও বিশেষ দল গঠনের প্রয়োজন পড়ল? গোয়েন্দা সূত্রে খবর, রাজ্যের জনপ্রতিনিধিদের সই জাল করার এই চক্রটি কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর জাল অনেক গভীরে এবং পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) রাজ্যের একাধিক জেলায় ছড়িয়ে থাকতে পারে বলে জোরালো সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপার ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে দ্রুত এবং সঠিক সমন্বয় রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। সাধারণ তদন্ত প্রক্রিয়ায় এই কাজটা অনেকটাই সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। একাধিক জেলার মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান আরও মসৃণ করতে এবং সন্দেহভাজনদের ট্র্যাক করতেই এই বিশেষ টিম তৈরি করা হয়েছে, যাতে তদন্তের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্রই মাঝপথে হারিয়ে না যায়।
এই মুহূর্তে তদন্তকারীদের প্রাথমিক ও প্রধান লক্ষ্য হল, কীভাবে এবং ঠিক কোথা থেকে এই সই-কাণ্ডের সূত্রপাত, তার আসল শিকড়টি খুঁজে বের করা। শাসক দলের বিধায়কদের সই নিয়ে এমন বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় স্বভাবতই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল পড়েছে। বিরোধী শিবিরগুলিও এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছে। কলকাতা (Kolkata) এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়িয়ে দূরের জেলাগুলিতেও এই জালিয়াতি চক্রের মাথা বা মাস্টারমাইন্ডরা লুকিয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। তাই সিটের সদস্যরা এখন আন্তঃজেলা সমন্বয়ের উপর সর্বাধিক জোর দিচ্ছেন। এই বিশেষ দলে সিআইডির অত্যন্ত দুঁদে এবং অভিজ্ঞ আধিকারিকদের রাখা হয়েছে, যাঁরা এর আগেও রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বড়সড় অপরাধ চক্রের জাল কেটে পর্দাফাঁস করেছেন।
অন্যদিকে, এই মামলার আগামী দিনের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করছে আসন্ন সোমবারের জিজ্ঞাসাবাদের উপর। এদিন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিষেককে সিআইডির সদর দফতর ভবানী ভবনে (Bhabani Bhavan) হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সই-কাণ্ডের সঙ্গে তাঁর ঠিক কী সম্পর্ক, তিনি এই বিরাট চক্রের ভেতরের কোনো গোপন তথ্য জানেন কি না, অথবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর কোনো ইন্ধন রয়েছে কি না— মূলত এই দিকগুলি খতিয়ে দেখতেই তাঁকে ম্যারাথন জেরা করা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তদন্তকারী আধিকারিকরা ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ফরেনসিক প্রমাণ, কাগজপত্রের খসড়া এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সংগ্রহ করেছেন, যেগুলি সামনে রেখেই তাঁকে জেরা করা হবে।
সব মিলিয়ে, বিধায়কদের সই জালিয়াতির এই বিতর্ক এখন এক নতুন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কারবারিরা— সকলেরই নজর এখন আগামী সোমবারের দিকে। জেরার পর নতুন কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে কি না, নাকি তদন্তের জাল আরও কোনো প্রভাবশালীর দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে একটা বিষয় জলের মতো পরিষ্কার যে, জালিয়াতদের দ্রুত আইনের জালে বন্দি করতে এবং জনপ্রতিনিধিদের সম্মান রক্ষার্থে এবার রীতিমতো কড়া হাতে ময়দানে নেমেছে প্রশাসন।


Recent Comments