অশোক সেনগুপ্ত
ফের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যস্ততা ও চাপ থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি। আপাতত মূলত পড়াশোনা ও গবেষণার মাধ্যমেই সময় কাটাতে চান ডঃ সোনালি চক্রবর্তী বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘উচ্চতর স্তরের সহসা চাপে’ ফের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে তাঁকে। এবার তিনি ছিলেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
এর আগে ২০১৭ থেকে তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর সাফল্যের সাথে উপাচার্য থাকার পর দ্বিতীয় বার পুনরায় নিয়োগের সময় ২০২১ সালে তাঁকে আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল। আসলে সকল উপাচার্য-নিয়োগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আইনি জটিলতা এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছিল, যা এ রাজ্যে তো বটেই, গোটা দেশেও একটা নজীর তৈরি করেছিল।

কেন তৈরি হয়েছিল ওই সমস্যা? শিক্ষামহলের খবর, আগের বার রাজ্যের ২৪ জন উপাচার্যের নিয়োগ নিয়ে ২০২২-এ প্রশ্ন তোলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়। অভিযোগ করেছিলেন, সব ক’টি নিয়োগই আচার্য-হিসাবে তাঁর সম্মতি ছাড়া হয়েছে।
ইউজিসির নিয়ম অনুযায়ী রাজ্যের রাজ্যপালই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। তাঁর অধীনস্থ যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেই নিয়োগের জন্য রাজ্যপালের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু রাজ্যপালের পদে থাকাকালীন ধনখড়ের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের টানাপড়েনের মধ্যে যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নানাজনকে পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য, তখন সেই নিয়ম মানা হয়নি।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব হারিয়ে ডঃ সোনালি একদিনের জন্য তিনি যে বিভাগের শিক্ষিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দিয়ে ছুটিতে চলে যান। পর্যায়ক্রমে দীর্ঘ অর্জিত ছুটিতে ছিলেন। এর পর অনেক ঘটনা ঘটে। শেষ কালে দেশের সুপ্রিম কোর্ট নিজের হাতে পশ্চিম বাংলার ৩৬ টি রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬ জন উপাচার্যের নিয়োগের ভার তুলে নিয়ে কাজে এগোয়।

ইউজিসি- র প্রতিনিধি, রাজ্যপালের প্রতিনিধি সহ বহু বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করা হয় এই প্রক্রিয়ায়। স্বয়ং সুপ্রিম কোর্ট নিজে হাতে এই কাজ করে। মাথায় আনা হয় দেশের আগের প্রধান বিচারপতি ইউ ইউ ললিতকে। বিচারপতি ললিতের পরিচালনায় কাজে নামেন দেশের সব নামী বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্ট এই প্রক্রিয়ার তদারকি করে।
দেশ জুড়ে সব কাগজে পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন বার হয়। কয়েকশো প্রার্থী আবেদন করেন। মাসের পর মাস ধরে বাছাই প্রক্রিয়া চলে। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ললিত বারবার কলকাতা আসেন এই পরীক্ষা নিতে।

শিক্ষামহলের খবর, ডঃ সোনালিকে বারাসতের পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সেখানে একটি বৈঠকে অংশ নিলেও ব্যক্তিগত কারণে আর যাননি। সব স্তরে সফল হয়ে কলকাতা ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে নিযুক্ত হওয়ার জন্য প্যানেলে ছিলেন। দাবি, ডঃ সোনালি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর যেতে চান নি। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের সুপারিশে রাজ্যপাল ডঃ সোনালিকে এবার রবীন্দ্রভারতীতে উপাচার্য নিয়োগ করেন।
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর আবার তাঁর উপর নেমে এল সহসা নির্দেশ। সহসা আবার চাপের মুখে ইস্তফা দিতে বাধ্য হলেন ডঃ সোনালি। ঘনিষ্ঠমহলে তাঁর প্রশ্ন, তাঁর অপরাধ কোথায়?

রাজ্যের শাসক শ্রেণীর চোখের বালি হয়ে নানা সময় প্রচণ্ড চাপ এবং রাজনৈতিক ছাত্র বা কর্মী সংগঠনের তীব্র বাধার মুখে পড়েছিলেন
একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মনোনীত কিছু উপাচার্য। বাম আমলে সন্তোষ ভট্টাচার্যর (১৯৮৪-১৯৮৭) মেয়াদ ছিল রাজনৈতিক সংঘাত ও তীব্র অসহযোগিতায় পূর্ণ। তৎকালীন রাজ্যপাল ও আচার্য এ. পি. শর্মা বামফ্রন্টের মনোনীত প্যানেল অগ্রাহ্য করে তাঁকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ করায় তিনি শাসকদলের রোষানলে পড়েন। তৃণমূল আমলের শেষ পর্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ শান্তা দত্ত দে, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শুভ্রকমল মুখোপাধ্যায় এবং বাবাসাহেব অম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবল চাপ ও বিরোধিতার মুখে পড়েন। তৈরি হয় আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতি। সংবাদমাধ্যমে নিরন্তর খবর হয়েছিল সেগুলো। কিন্তু সোনালি চক্রবর্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধুনা পদত্যাগ হল নিঃশব্দে। এক অর্থে এটি অভূতপূর্বও বটে!


Recent Comments