রাজ্য সরকারের নতুন নির্দেশে সরকারি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ব্যক্তিগত টিউশন বা গৃহশিক্ষকতা বন্ধ হওয়ার পর মালদা জেলার বহু পড়ুয়া ও অভিভাবক চরম সমস্যার মুখে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা স্কুল শিক্ষকদের কাছেই বাড়তি পড়াশোনার জন্য নির্ভর করতেন, তাঁরা এখন নতুন শিক্ষক খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকাগুলিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আগামী অগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে বিভিন্ন শ্রেণির দ্বিতীয় ইউনিট টেস্ট শুরু হওয়ার কথা। পরীক্ষার আগে হঠাৎ করে টিউশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক ছাত্রছাত্রীর প্রস্তুতিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, নতুন গৃহশিক্ষক পাওয়া গেলেও তাঁদের পারিশ্রমিক আগের তুলনায় অনেক বেশি, যা অনেক পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন।
মালদার ইংরেজবাজার শহরে একাধিক কোচিং সেন্টার থাকায় সেখানে বিকল্প ব্যবস্থা কিছুটা হলেও রয়েছে। তবে হবিবপুর, বামনগোলা, গাজোল, মানিকচকের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওইসব অঞ্চলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি স্কুলের শিক্ষকরাই ছাত্রছাত্রীদের অতিরিক্ত পড়াশোনার দায়িত্ব নিতেন। সরকারি নির্দেশ কার্যকর হওয়ার পর তাঁরা টিউশন বন্ধ করে দেওয়ায় বহু পরিবার কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
অনেক অভিভাবক ও পড়ুয়াকে এখন ভালো শিক্ষকের খোঁজে ২৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের শহরমুখী হতে হচ্ছে। কিন্তু দূরত্ব, যাতায়াত খরচ এবং সময়ের কারণে সেই ব্যবস্থাও সবার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গ্রামীণ এলাকার ছাত্রছাত্রীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পড়ুয়াদের একাংশ জানিয়েছে, এতদিন নিয়মিতভাবে সরকারি শিক্ষকদের কাছে পড়ে তারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিত। হঠাৎ করে সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন শিক্ষকের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এর সরাসরি প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলের উপর পড়তে পারে।
অন্যদিকে, অভিভাবকদের বক্তব্য, সন্তানদের পড়াশোনার স্বার্থে বিকল্প শিক্ষক খুঁজতে বাধ্য হলেও বর্তমানে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক গৃহশিক্ষক আগের তুলনায় বেশি পারিশ্রমিক দাবি করছেন। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের একাংশের দাবি, তাঁরা বহু বছর ধরে পড়ুয়াদের সুবিধার জন্য বাড়িতে বা ছোট কোচিং গ্রুপে পড়াতেন। কিন্তু শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশ মেনে এখন সেই কাজ বন্ধ করতে হয়েছে। পড়ুয়াদের অসুবিধার বিষয়টি তাঁদেরও খারাপ লাগছে, তবে সরকারি নিয়ম মেনে চলা ছাড়া তাঁদের আর কোনও উপায় নেই।
জেলা শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী সব স্কুলে টিউশন সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার নোটিস পাঠানো হয়েছে। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে পড়ুয়াদের যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও প্রশাসনের নজরে রয়েছে এবং সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা চলছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মালদার বহু পরিবার একটাই প্রশ্ন তুলছে—পরীক্ষার আগে পড়ুয়াদের পড়াশোনার ক্ষতি না করে কীভাবে এই নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে? সরকারি নির্দেশ কার্যকর হলেও সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।


Recent Comments