আসন্ন ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পারদ ক্রমশ চড়ছে। শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে চলছে তীব্র রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ। এরই মধ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা ভবানীপুর (Bhabanipur) বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) বিরুদ্ধে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করল ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party)। বিজেপির অভিযোগ, প্রকাশ্য জনসভা থেকে ইভিএম এবং ভিভিপ্যাট নিয়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন তৃণমূল নেত্রী।
গত ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (Chief Electoral Officer) কাছে এই কড়া অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে বঙ্গ বিজেপি। চিঠিতে বিশেষ করে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলা (Pingla) বিধানসভা কেন্দ্রে (২২৭ নম্বর কেন্দ্র) আয়োজিত একটি তৃণমূল কংগ্রেসের (All India Trinamool Congress) জনসভার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজেপির দাবি, ওই জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গুরুতর অভিযোগ করেন যে, নির্বাচন কমিশনের সাহায্যে বিজেপি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারচুপি করার চেষ্টা করছে। তিনি প্রকাশ্যে এমন দাবিও করেছেন যে, ভোটিং মেশিন বা ভিভিপ্যাট খারাপ হলে নির্বাচন আধিকারিকরা তা পরিবর্তন না করে তার ভেতরে একটি “চিপ” ঢুকিয়ে দেবেন। আর সেই কারচুপি চলার সময় ভোটারদের ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এই ধরনের মন্তব্যকে ‘অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন’ এবং ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে তোপ দেগেছে গেরুয়া শিবির। বিজেপির মতে, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক সংস্থা, যার প্রধান কাজই হল সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন পরিচালনা করা। একজন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এমন মন্তব্য কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা এবং মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করে। দলের তরফ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ সাধারণ ভোটারদের মনে অকারণে ভয় ও সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের ওপর এই ধরনের মানসিক আক্রমণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
শুধু তাই নয়, বিজেপির তরফে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে যে, মুখ্যমন্ত্রীর এই আচরণ সরাসরি আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি বা মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট (Model Code of Conduct)-এর পরিপন্থী। চিঠিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এর আগেও কেন্দ্রীয় বাহিনী (Central Forces) এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মিথ্যে প্রচার এবং ভোট পরবর্তী হিংসায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার কমিশনে নালিশ জানানো হয়েছে। কিন্তু অতীতে কোনো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগকারীদের দাবি। বিজেপির অভিযোগ, এই নিষ্ক্রিয়তার কারণেই শাসক দল এই ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর সাহস পাচ্ছে এবং তারা এটাকেই নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে নির্বাচন কমিশনের কাছে মোট ৪টি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছে বিজেপি:
১. আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অবিলম্বে উপযুক্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২. ভোটিং মেশিন সম্পর্কে এই ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করা থেকে তাঁকে বিরত থাকার জন্য কড়া নির্দেশিকা জারি করতে হবে। ৩. ভোটারদের আশ্বস্ত করার জন্য মেশিনগুলির নিরাপত্তা ও প্রোটোকল বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে প্রকাশ্যে একটি স্পষ্টীকরণ দিতে হবে। ৪. অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে এই ধরনের অপপ্রচার রুখতে প্রয়োজনীয় সমস্ত রকম পদক্ষেপ অবিলম্বে গ্রহণ করতে হবে।
বিজেপির দুই শীর্ষ নেতা ডঃ মহেশ শর্মা (Dr. Mahesh Sharma) এবং শিশির বাজোরিয়া (Shishir Bajoria) স্বাক্ষরিত এই অভিযোগপত্রের সঙ্গে প্রমাণস্বরূপ ওই নির্দিষ্ট জনসভার একটি ভিডিও লিঙ্কও জমা দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের বিরুদ্ধে ওঠা এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে কমিশন কতটা কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশনের পরবর্তী ভূমিকার দিকেই এখন নজর রয়েছে তামাম রাজ্যবাসীর।

Recent Comments