Sharanya Ghosh: প্রাগৈতিহাসিক যুগ এবং ডাইনোসরদের রহস্য নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। আর এবার বিজ্ঞানের জগতে এল এক যুগান্তকারী ও অভাবনীয় আবিষ্কার। প্রায় ১১ কোটি ৫০ লক্ষ বছর (১১৫ মিলিয়ন বছর) আগের একটি ডাইনোসরের জীবাশ্মীভূত হাড়ের ভেতরে লোহিত রক্তকণিকার (Red Blood Cells) মতো ক্ষুদ্র গঠন এবং রক্তের রাসায়নিক বা ‘হিম’ (Heme) উপাদানের অস্তিত্ব খুঁজে পেলেন গবেষকেরা। এই ঘটনায় রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে বৈজ্ঞানিক মহলে।
কোথায় ও কোন ডাইনোসরের জীবাশ্মে মিলল এই চিহ্ন?
গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘আরাটাসরাস’ (Aratasaurus) নামক একটি ছোট আকৃতির মাংসাশী ডাইনোসর। আজ থেকে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এই প্রজাতির ডাইনোসররা বসবাস করত। ২০০৮ সালে ব্রাজিলের একটি খনি থেকে এই ডাইনোসরটির পিছনের পায়ের হাড়ের জীবাশ্ম উদ্ধার করা হয়েছিল, যা দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ছিল।
কীভাবে ধরা পড়ল রক্তের চিহ্ন?
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত জৈব-ভূরসায়নবিদ অধ্যাপক ক্লিটি গ্রাইসের (Kliti Grice) নেতৃত্বে একদল গবেষক আধুনিক ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ও উন্নত রাসায়নিক বিশ্লেষণ প্রযুক্তির সাহায্যে ওই হাড়ের অভ্যন্তরীণ গঠন পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার সময় তাঁরা হাড়ের ভেতরে রক্তনালীর মতো সূক্ষ্ম নালিপথে অসংখ্য ডিম্বাকৃতি ও গোলাকার ক্ষুদ্র গঠন দেখতে পান।
শুধু বাহ্যিক আকৃতি দেখেই বিজ্ঞানীরা থেমে থাকেননি; তারা এর রাসায়নিক পরীক্ষা চালান। গবেষণায় জানা যায় যে, ওই কোষের মতো গঠনগুলোর ভেতরে রক্তে অক্সিজেন বহনকারী প্রোটিন হিমোগ্লোবিনের মূল উপাদান তথা ‘হিম’ (Heme)-এর রাসায়নিক চিহ্ন বা যৌগ বিদ্যমান। এছাড়া হাড়ের নমুনায় কোলাজেন তৈরির সঙ্গে যুক্ত অ্যামাইনো অ্যাসিডের উপাদানের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে।
কোটি কোটি বছর ধরে কীভাবে টিকে রইল এই উপাদান?
সাধারণত দীর্ঘ মিলিয়ন বছর ধরে কোনো জৈব পদার্থ বা নরম টিস্যু সম্পূর্ণ পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, হাড়ের ভেতরে থাকা ‘হাউসম্যানাইট’ নামক ম্যাঙ্গানিজযুক্ত বিশেষ কিছু খনিজ যৌগ হয়তো জীবাশ্মীভূত হওয়ার আগে এই সূক্ষ্ম রক্তকণিকা ও প্রোটিনগুলিকে রক্ষা করতে এবং স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছিল।
বিজ্ঞানী মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
যদিও এই আবিষ্কারকে ঐতিহাসিক বলে মনে করা হচ্ছে, তবুও এটি নিয়ে কিছু বৈজ্ঞানিক বিতর্ক ও সংশয় রয়েছে। অনেক গবেষক মনে করেন যে, হাড়ের ভেতরের ওই গঠনগুলি হুবহু আসল রক্তকণিকা কি না, তা নিয়ে আরও গভীর পরীক্ষার প্রয়োজন। তাছাড়া এই আবিষ্কার থেকে ডাইনোসরের কোনো অক্ষত ডিএনএ (DNA) পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তা সত্ত্বেও, এত প্রাচীন জীবাশ্মের ভেতরে রক্তের অবশিষ্টাংশের রাসায়নিক স্বাক্ষর পাওয়ার এই ঘটনা প্রাগৈতিহাসিক যুগের জীবিক ও জৈব অণুর স্থায়িত্ব নিয়ে গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশা, এই সফল পদ্ধতির পথ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় থাকা অন্যান্য পুরোনো জীবাশ্মগুলি নতুন করে পরীক্ষা করলে আরও বহু অজানা রহস্যের উন্মোচন হতে পারে।

Recent Comments