তামাক সেবনের মারাত্মক কুফল সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এবং ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণগুলি চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে কলকাতায় এক বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হলো। ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ (World No Tobacco Day) উপলক্ষে কলকাতার এইচসিজি ক্যানসার হাসপাতাল (HCG Cancer Hospital, Kolkata)-এর পক্ষ থেকে একটি বড়সড় সচেতনতা কর্মসূচি এবং বিনামূল্যে মুখের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ওরাল স্ক্রিনিং (Oral Screening) শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। হাসপাতালের আশেপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া এবং শিক্ষকরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। তামাকমুক্ত সমাজ গঠন এবং ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতা গড়ে তোলাই ছিল এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ নতুন মুখের ক্যানসার (Oral Cancer) ধরা পড়ে। তামাককে একটি ‘নীরব ঘাতক’ (Silent Killer) হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীরা একদম শেষ পর্যায়ে এসে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন।
অভিনব ‘পান’ ক্যাম্পেন ও স্ক্রিনিং পদ্ধতি
এই বিশেষ স্ক্রিনিং শিবিরের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুখগহ্বর এবং মাথা ও ঘাড়ের (Head and Neck) অংশে ক্যানসারের কোনো প্রাথমিক লক্ষণ বা সতর্কতা সংকেত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। চিকিৎসকরা অংশগ্রহণকারীদের গালের ভেতরের অংশ (Buccal Mucosa), তালু, জিব এবং ঠোঁটে কোনো লাল বা সাদা দাগ রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করেন। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন ধরে না সারা ঘা (Ulcer), মুখের ভেতরের ফোলা ভাব বা গলার স্বরের পরিবর্তন কেন বিপজ্জনক হতে পারে, সেই বিষয়েও সকলকে পরামর্শ দেওয়া হয়।
এইচসিজি (HCG) হাসপাতালের দেশব্যাপী চলা ‘প্রিভেন্ট অ্যাডিকশন অ্যাভয়েড নিকোটিন’ বা ‘পান’ (PAAN – Prevent Addiction Avoid Nicotine) অভিযানের অংশ হিসেবে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। এই প্রচার অভিযানে পানের দোকানের আদলে তৈরি বিশেষ কিওস্ক (Kiosk) ব্যবহার করে তামাকের ভয়াবহ ঝুঁকি এবং দৃশ্যমান প্রচারের মাধ্যমে মানুষের চোখ খোলার চেষ্টা করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনেদের উদ্বেগ ও বার্তা
এই সচেতনতা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ ইউনিভার্সিটির (Techno India Group Universities) প্রো-চ্যান্সেলর তথা সেন্ট্রাল অ্যাকাডেমিক লিডার অধ্যাপক ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায় (Prof Dhrubajyoti Chattopadhyay)। তিনি তামাকের ক্ষতিকারক দিকগুলো জানা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আসুন আমরা সবাই তামাক থেকে দূরে থাকার শপথ নিই এবং দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে আমাদের পরিচিত সবার মধ্যে এই বার্তা ছড়িয়ে দিই।”
অনুষ্ঠানে তামাকের নেশা সমাজে কতটা গভীরে শিকড় গেড়েছে তা বোঝাতে গিয়ে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স ইউনিভার্সিটি (St. Xavier’s University, Kolkata)-র সোশ্যাল ওয়ার্ক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জ্যাকব ইসলামি (Prof Jacob Islary) ১৫ বছর আগে অসমে (Assam) তাঁর একটি অভিজ্ঞতার কথা রসিকতার ছলে শেয়ার করেন। তিনি জানান, সেই সময় একটি সচেতনতা শিবিরের ঠিক আগে চিকিৎসকদের গুটখা চিবানো বন্ধ করতে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। তবে এই সভাকক্ষে কেউ তামাক ব্যবহার করছেন না দেখে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন।
“ধূমপানের মধ্যে কোনো হিরোগিরি নেই”
এইচসিজি কলকাতা (HCG Kolkata)-র হেড অ্যান্ড নেক অনকোসার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডঃ শ্রেয়া ভট্টাচার্য (Dr Shreya Bhattacharya) অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এক তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমার আউটডোরে (OPD) যে সমস্ত রোগীরা আসেন, তাঁদের মধ্যে ৮০ শতাংশই মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত। এবং তাঁদের মধ্যে ৫০ শতাংশই মারা যান, কারণ তাঁরা একদম শেষ স্তরে (Advanced Stage) আমাদের কাছে পৌঁছান।” তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “বিশ্বাস করুন, ধূমপানের মধ্যে কোনো হিরোগিরি বা কুল (Cool) ব্যাপার নেই।”
এইচসিজি ক্যানসার হাসপাতালের পূর্ব ও অন্ধ্রপ্রদেশ অঞ্চলের আঞ্চলিক বিজনেস হেড ডঃ রূপালী বসু (Dr Rupali Basu) বলেন, “আমরা আমাদের এই স্ক্রিনিং কার্যক্রমে তরুণ প্রজন্মকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ যুব সমাজই পারে ক্যানসারের মতো মারণ রোগকে প্রতিরোধ করতে সমাজের সেরা অংশীদার হতে। একজন যুবকের বৈজ্ঞানিক সচেতনতা ও দৃঢ় মানসিকতা তার পরিবার, বন্ধু এবং সমগ্র সমাজকে বদলে দিতে পারে।”
এদিনের অনুষ্ঠানে সেন্ট জেভিয়ার্স ইউনিভার্সিটির (St. Xavier’s University, Kolkata) সোশ্যাল ওয়ার্ক বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারের ছাত্রী নন্দিনী শর্মা (Nandini Sharma)-সহ বহু শিক্ষার্থী হাসপাতালের ‘পান’ (PAAN) কাউন্টারে গিয়ে নিজেদের মুখের স্ক্রিনিং করান। অনুষ্ঠানে হাসপাতালের সিওও (COO) গুরবিন্দর সিং (Mr Gurvinder Singh)-ও উপস্থিত ছিলেন। ক্যানসার মুক্ত সুস্থ সমাজ গড়তে হাসপাতালের এই অভিনব প্রয়াসকে সাধুবাদ জানিয়েছেন কলকাতার নাগরিক মহল।


Recent Comments