পুজোর আনন্দে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন তিনি। ইচ্ছে ছিল, ছেলের আবদার মেনে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ ঘুরে দেখবেন। কিন্তু সেই আনন্দের সফরই যে জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি আগরপাড়ার বাসিন্দা অনুকূল সরকার। চোরবাগানের দুর্গাপুজোর মণ্ডপে হঠাৎ তৈরি হওয়া প্রবল ভিড় ও ধাক্কাধাক্কির মধ্যে হারিয়ে যায় তাঁর ১৩ বছরের ছেলে প্রাঞ্জল। ভিড়ের চাপে বিপন্ন হয়ে পড়া একের পর এক শিশুকে উদ্ধার করতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের সন্তানকেই আর বাঁচাতে পারলেন না। ছেলেকে হারানোর শোক আর সেই রাতের ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁকে।
উত্তর ২৪ পরগনার আগরপাড়ার তেঁতুলতলা এলাকার বাসিন্দা অনুকূল সরকার। পরিবারের সদস্য, বন্ধু এবং তাঁদের সন্তানদের নিয়ে মোট ১৩ জনের একটি দল চোরবাগানের মণ্ডপ দেখতে গিয়েছিল। সেই দলের মধ্যেই ছিল প্রাঞ্জল। মাত্র ১৩ বছরের এই কিশোর সাঁতারেও যথেষ্ট পারদর্শী ছিল। বাড়িতে ছড়িয়ে রয়েছে তার নানা সাফল্যের স্মারক, পদক ও পুরস্কার। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিল পরিবার। কিন্তু সপ্তমীর সন্ধ্যায় কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
অনুকূলের বর্ণনা অনুযায়ী, মণ্ডপে আচমকাই ভিড় বেড়ে যাওয়ায় শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কে কোন দিকে যাবেন, তা বোঝার উপায় ছিল না। ভিড়ের চাপে একের পর এক মানুষ মাটিতে পড়ে যেতে থাকেন। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই কখন ছেলের হাত ছেড়ে গিয়েছে, প্রথমে বুঝতেই পারেননি অনুকূল। পরে যখন বুঝতে পারেন প্রাঞ্জল তাঁর সঙ্গে নেই, তখন চারদিকে খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু প্রবল ভিড়, মানুষের চিৎকার আর বাঁচার আকুতির মধ্যে ছেলেকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে।
নিজের সন্তানকে খুঁজে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালানোর মধ্যেও ভিড়ের চাপে রাস্তায় পড়ে যাওয়া অন্য শিশুদের অসহায় অবস্থা চোখ এড়ায়নি অনুকূলের। নিজের ছেলের কথা ভেবে উদ্বেগে থাকলেও বিপন্ন শিশুদের ফেলে এগিয়ে যেতে পারেননি তিনি। হাতের কাছে যাদের পেয়েছেন, তাদেরই ভিড়ের মধ্যে থেকে টেনে বার করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর দাবি, সাত-আট জন শিশুকে উদ্ধার করতে সাহায্য করেছিলেন তিনি। কিন্তু এই উদ্ধারকাজের মধ্যেই যে তাঁর নিজের ছেলের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে, তা তখনও জানতেন না।
সেই রাতের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলির একটি ঘটে প্রাঞ্জলের বন্ধু আহানাকে ঘিরে। ভিড়ের চাপে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল সে। অনুকূল তাকে দেখতে পেয়ে কোনও রকমে ভিড় থেকে টেনে বার করেন। রাস্তার উপর শুইয়ে তার বুকে চাপ দিতে থাকেন। আহানার তখন জ্ঞান ছিল না। বেশ কয়েক মিনিট ধরে সিপিআর দেওয়ার পর ধীরে ধীরে জ্ঞান ফেরে তার। বন্ধুর সন্তানকে এ ভাবে উদ্ধার করতে পেরে কিছুটা স্বস্তি পেলেও নিজের ছেলের চিন্তা তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি দেয়নি। স্ত্রী প্রিয়াঙ্কার কাছে আহানাকে রেখে আবারও প্রাঞ্জলের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন তিনি।
এ দিকে সময় যত এগোতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে উৎকণ্ঠা। চারদিকে তখনও আতঙ্ক ও বিভ্রান্তির পরিবেশ। এরই মধ্যে মণ্ডপ ভেঙে যাওয়ার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের কাছে বারবার ছেলের শারীরিক গঠন ও পরিচয়ের বিবরণ দিয়ে জানতে চান অনুকূল। কেউ প্রাঞ্জলকে দেখেছেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন তিনি। অবশেষে এক মহিলা পুলিশকর্মীর কাছ থেকে জানতে পারেন, একটি শিশুকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এই খবর পেয়ে আর দেরি করেননি অনুকূল। মণ্ডপের প্রবেশপথের বাইরে একটি ছোট মেডিক্যাল সহায়তা কেন্দ্রের কাছে গিয়ে শুয়ে থাকা শিশুটিকে দেখতে পান তিনি। কাছে যেতেই চিনতে পারেন নিজের ছেলেকে। কিন্তু সেই মুহূর্তে সন্তানের কী অবস্থা, তা বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন বাবা। আশপাশের লোকজনের কাছে অ্যাম্বুল্যান্স কিংবা বাইকের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আবেদন জানান। শেষ পর্যন্ত এক বাইকচালক এগিয়ে আসেন। প্রাঞ্জলকে নিয়ে অনুকূলকে পিছনে বসিয়ে তিনি দ্রুত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দেন।
হাসপাতালে পৌঁছেও হাল ছাড়েননি অনুকূল। ছেলেকে বাঁচানোর আশায় একটানা সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষরক্ষা হয়নি। প্রাণ হারায় ১৩ বছরের প্রাঞ্জল। যে বাবা কিছুক্ষণ আগেও ভিড়ের মধ্যে থেকে অন্য শিশুদের প্রাণে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, সেই বাবার চোখের সামনেই নিভে গেল নিজের সন্তানের জীবন। শেষ পর্যন্ত ছেলের মৃত্যুসংবাদ ফোনে স্ত্রী প্রিয়াঙ্কাকে জানাতে হয় তাঁকে।
এর পর থেকে সরকার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। বাড়ির চারদিকে ছড়িয়ে থাকা প্রাঞ্জলের পদক, পুরস্কার ও সাঁতারের সাফল্যের স্মারকগুলি এখন পরিবারের কাছে শুধুই হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের স্মৃতি। যে ছেলেকে ঘিরে এত পরিকল্পনা ছিল, সেই ছেলেই আজ আর বাড়ি ফিরবে না—এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না অনুকূল ও প্রিয়াঙ্কা কেউই। শোকে ভেঙে পড়েছেন প্রাঞ্জলের মা। খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন তিনি বলে জানা গিয়েছে।
প্রাঞ্জলের জন্য সামনে অপেক্ষা করছিল আরও একটি আনন্দের সফর। আগামী রবিবার পরিবারের মেঘালয় ভ্রমণে যাওয়ার কথা ছিল। সেই ভ্রমণ নিয়ে যথেষ্ট উচ্ছ্বসিত ছিল কিশোরটি। কিন্তু আর কোনও দিন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে না। যে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল আনন্দের স্মৃতি তৈরি করার জন্য, তার আগেই এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা কেড়ে নিল পরিবারের সবচেয়ে আদরের সদস্যকে।
বুধবার প্রাঞ্জলের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই সময় অনুকূল মণ্ডপের ভিতরে ভিড়ের পরিস্থিতি, উদ্ধারকাজের অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের অভিযোগ ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। পানিহাটির বিধায়ক রত্না দেবনাথও নিয়মিত তাঁদের বাড়িতে যাচ্ছেন এবং শোকস্তব্ধ পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। নিজের মেয়েকে হারানোর অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রাঞ্জলের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
চোরবাগানের এই দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। ভিড়ের চাপে তৈরি হওয়া বিপর্যয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উদ্ধারকাজ নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। ঘটনার তদন্তে সাত সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দিকে, দুর্ঘটনার কারণ ও দায়িত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়াও চলছে।
কিন্তু তদন্ত, অভিযোগ কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপের বাইরে অনুকূল সরকারের পরিবারের কাছে থেকে গিয়েছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। যে বাবা নিজের বিপদের কথা ভুলে অন্য শিশুদের বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন, তিনি আজও মনে মনে খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই মুহূর্তটিকে, যে মুহূর্তে ছেলের হাত তাঁর হাত থেকে ছুটে গিয়েছিল। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে প্রাঞ্জলের মুখ আর সেই ভয়াবহ ভিড়ের ছবি। অন্য শিশুদের উদ্ধার করতে পেরেও নিজের সন্তানকে বাঁচাতে না পারার যন্ত্রণা তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে। পুজোর আনন্দের বদলে তাঁর জীবনে এখন শুধুই শূন্যতা, স্মৃতি আর এক বাবার অসহায় দীর্ঘশ্বাস।


Recent Comments