অশোক সেনগুপ্ত
“আমার মনে হয় যে স্ট্রংরুমে পাহাড়া দেওয়াটা একটা রাজনৈতিক গিমিক ছাড়া কিছুই না। আমার দল এবং সব রাজনৈতিক দলই করে থাকে। কিন্ত ইভিএম বদল করে দেওয়াটা বাস্তবে অসম্ভব।” এই মন্তব্য জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে প্রায় পাঁচ দশক ধরে যুক্ত যাদবপুর ব্লক কংগ্রেসের সভাপতি পার্থ প্রতিম রায়ের (বুলা)।
তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, “আমি ছোট থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। যাদবপুর ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলের নির্বাচন ও নির্বাচনী কাজকর্ম সামনে প্রত্যক্ষ করেছি। আগে ব্যালট পেপারের নির্বাচন দেখেছি, এখন EVM এ নির্বাচন হতে দেখছি।
দু’ধরনের নির্বাচন নিয়ে আমার সংক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতা থেকে আমার ধারণা হয়েছে যে আগের দিনে ব্যালট পেপারের ভোট গোনা কাজ আমরা যখন করতাম, তখন বিরোধীদলের এজেন্টদের সঙ্গে আমাদের বিভিন্ন কারনে লড়াই হতো।
আমরা লক্ষ্য করতাম, ব্যালট পেপার গণনার সময়, স্ট্যাম্পের ছাপটা clockwise না anti clockwise, ছাপাটা প্রতীকের ভেতরে কত ভাগ, যদি বেশি অংশ থাকে তাহলে যার দিকে পরবে ভোট তার অনুকূলে যাবে, ব্যালট পেপারের উল্টো দিকেও যদি কেউ ছাপ মারে, সেটা যদি প্রতীকের উপর পরে , তবুও valid vote হিসেবে গ্রাহ্য হবে। স্ট্যাম্প পরলো না শুধু কালো কালি পরলো। সেক্ষেত্রে ভোটারের intention ta বিচার করা হতো। বৈধ ভোট বাতিল করা কষ্টকর হতো।
ব্যালটে গণনার ক্ষেত্রে এজেন্টদের একটা বড়ো/ মূখ্য ভুমিকা থাকতো। কারন, গণনা টেবিলে কোন রকম প্রতিবাদ না করলে, উভয়ের এজেন্টদের উপস্থিতিতে যেটা গোনা হয়ে যেতো সেটাই সঠিক বলে গ্রাহ্য হতো। পরবর্তী সময়ে মামলা মোকদ্দমা হলে সেটা অন্য রকম ব্যাপার হতো! স্ট্রংরুমে ভর্তি ব্যালট বক্স পাহাড়া দেওয়া সেই সময় ও একটা রীতি ছিল, কিন্ত অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় যে পুরো বাক্স বদলে দেওয়া বা সরিয়ে ফেলা বা নতুন ভর্তি বাক্স এনে সেই জায়গাতে রেখে দেওয়া খুবই শক্ত বা অসম্ভব।
সব মিলিয়ে এই কাজ করা খুবই সময়সাপেক্ষ এবং অনেক হিসেবের ব্যাপার আছে। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে যে form 17C আছে, সেটা মিলিয়ে বদল করতে হবে। প্রচুর পরিশ্রম ও সময়ের ব্যাপার।
আগেও রাজনৈতিক দলগুলো স্ট্রংরুম-সুরক্ষা প্রচারের অঙ্গ হিসেবেই এটা বছরের পর বছর করতো। এটার বাস্তবতা সম্পর্কে আমি নিজেই সন্দিহান! স্ট্রংরুম পাহাড়া দেবার কাজ সব সময়ই আমার দল ও বিরোধীদল উভয়েই করেছে।
আজকের ইভিএম-এর সময়েও সবকিছু এজেন্টদের সামনেই হওয়া বাধ্যতামূলক! কিন্তু অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। এখন এজেন্টদের খুব একটা বড় ভূমিকা থাকে না। এক্ষেত্রে যন্ত্র যা বলবে, সেটাই সঠিক। যন্ত্রের ভূমিকাই মূখ্য! এখন কারচুপি করতে গেলে যন্ত্রে করতে হবে। কেউ কেউ বলছে, চিপ বদল করা হচ্ছে, সিস্টেম পরিবর্তন করা হচ্ছে, যেখানেই ভোট দেওয়া হোক সেটা শাসক দলের প্রতীকে গিয়ে যোগ হচ্ছে। কিন্তু এরকম করা আদৌ সম্ভব?
আমার মনে হয় কারচুপিটা যা হয়েছে, সেটা সুদুরপ্রসারি ভোটার তালিকা থেকে শুরু। আগেও পশ্চিমবঙ্গে এটা হতো। একই ভোটারের নাম অনেক জায়গাতেই উঠতো। বিভিন্ন বুথে দেখা যেতো একই ভোটারের নাম। এসআইআর পর্বে তো দেখলাম ব্রাজিলিয়ান মডেলের নাম। ভোটার-তালিকায় প্রায় ২২ জায়গাতে নাকি তাঁর নাম ছিল।
ভারতবর্ষে যদি কোনদিন পুরোপুরি একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, স্বৈরাচারী শাসক তখন অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্ত আজও এসব পুরোপুরি সম্ভব নয়। কারণ আমাদের উচ্চ আদালত আছে।
আমরা রাজনৈতিক দলগুলো স্ট্রংরুম পাহাড়া দিই মানুষকে প্রভাবিত করতে এবং দলীয় কর্মীদের উজ্জীবিত রাখতে। পরিবর্তন করাটা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। অন্য কারচূপি হয়ে থাকতে পারে, কিন্ত স্ট্রংরুমে করা অসম্ভব বলে আমার মনে হয়।”


Recent Comments