অশোক সেনগুপ্ত
যখন আমি ছাত্র ছিলাম, মানে আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগে আমার বাবা রেডিয়োতে খবর শুনতেন। প্রথমে আমি অতটা বুঝতাম না। আস্তে আস্তে রেডিয়ো শোনার সময় বাড়ল। পরে, ছুটির দিনে দুপুরে অনেকের মত বেতার-নাটক শোনাতেও আগ্রহ তৈরি হল।
বোরোলিনের সংসার, বোর্নভিটা কুইজ কনটেস্ট, গানের অনুষ্ঠান— এসব শুনতাম।
১৯৭১-এ যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল, আকাশবানী কলকাতার খবর ও সমীক্ষা শোনার জন্য লোকে মুখিয়ে থাকত। সবার কী উত্তেজনা! পাকিস্তানিরা যুদ্ধে ঘায়েল হচ্ছে। রেডিওর কথিকা, খবর শুনে মনে হচ্ছে যেন আমরাই সম্মুখ সমরে লড়ছি। জিতছি। এই বঙ্গে তখনও টিভি-র জন্ম হয়নি।




এর পর প্রযুক্তির দুনিয়া দ্রুত বদলে গেল। কিন্তু রেডিয়ো শোনার অভ্যেস বা তার রেশ থেকে গেল মানুষের মধ্যে। আস্তে আস্তে এফএম চ্যানেল এলো। কলেজের পাঠ শেষে প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ শিখে প্রথমে কয়েক বছর একাধিক সংস্থায় কম্পিউটার ক্ষেত্রে চাকরি। এর পর পেশাবদল করে ১৯৮৪ সালে হয়ে গেলাম সাংবাদিক। প্রথমেই নামী কাগজে, তার পর ১৯৯২ থেকে চার বছর সুযোগ হল বেতার-সাংবাদিকতার। রেডিয়োর হাত ধরে স্ত্রী ও ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে কাটিয়ে এলাম জার্মানিতে। গিয়েছিলাম ‘ডয়েচে ভেলে’, মানে ভয়েস অফ জার্মানির বাংলা বিভাগের সম্পাদক হিসাবে।
ওই চার বছর আমার জীবনের সোনালি সময়। ডয়েচে ভেলের বিভাগীয় উপপ্রধান আবদুল্লা আল ফারুখ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাংবাদিক। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর ১৯৭৪-এ ডয়েচে ভেলেতে বাংলা বিভাগের জন্ম। বিভাগের জন্ম থেকেই যুক্ত ছিলেন ফারুখদা।
রেডিয়োর কাজ করছি, পাশাপাশি সাঙ্ঘাতিকভাবে কাছ থেকে দেখছি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, দুই জার্মানির পুনরায় একত্রীকরণের পর ইওরোপীয় জীবন, ইওরোপ-আমেরিকার ঐতিহাসিক ও দ্রষ্টব্য নানা স্থানে সফর। সেগুলো নিয়ে প্রোগ্রাম করছি রেডিয়োতে। কত রকম অভিজ্ঞতা!
১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে ফের পুরনো কর্মস্থল আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দিলাম। রেডিয়োর স্মৃতি কিন্তু গেঁথে গেল অবচেতনের অন্দরতম অংশে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, পঙ্কজ মল্লিক আর বাণীকুমারের উত্তরসূরীদের সঙ্গে
মহালয়ার স্মৃতি নিয়ে কথা বলে ডিজিটালে ভিডিয়ো অনুষ্ঠান করার সুযোগ হল। মহালয়ার ত্রয়ীকে নিয়ে কাগজেও ফিচার লিখেছি।
মনে পড়ছে জার্মানিতে আউগসবুর্গে নেতাজী-দুহিতা অনিতা পাফের বাড়ি গিয়ে, বা বন-এ সদ্য নোবেলজয়ী রাইনহার্ড জেলটেন, প্রমুখের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা। ডয়েচে ভেলেতে থাকাকালীন বেতার-সাক্ষাৎকার নিয়েছি নবনীতা দেবসেন, কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রকাশক বাদল বসু, সফররত ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজিত পাঁজার সঙ্গেও।
সময় সব কিছু বদলে দেয়। বদলিয়েছে বেতারের ঘরানাকেও। তবু রেডিয়ো রয়ে গেছে মানুষের মনে, আমার স্মৃতির মণিকোঠাতেও। আগামীকাল, ১৩ই ফেব্রুয়ারি বিশ্ব রেডিয়ো দিবসে সেই ঝুলি থেকে বেড়িয়ে এলো অমলিন কথাগুলো।


Recent Comments