“ভাই ও বোনেরা, আমাকে সম্মানের সঙ্গে বলা হয়েছে যে ভারতের গৃহমন্ত্রী আজ এই অনুষ্ঠানে এসেছেন। আমি এখানে ভারতের গৃহমন্ত্রী হিসেবে আসিনি, আমি চৈতন্য মহাপ্রভুর একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে এখানে এসেছি।” এভাবেই বুধবার মায়াপুরে সমবেতদের মন জয়ের চেষ্টা করলেন অমিত শাহ।
তিনি বলেন, “এর আগে অনেকবার মায়াপুরে আসার পরিকল্পনা হয়েছিল, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। হয়তো মহাপ্রভুরই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আজ এই সৌভাগ্য হয়েছে যে যেখানে চৈতন্য মহাপ্রভু নিজে লীলা করেছেন, সেই মায়াপুরে আজ আমি আপনাদের সকলের দর্শন পাচ্ছি। আজ পরম পূজ্য শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর মহারাজের ১৫২তম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানও। তাই একপ্রকার মণিকাঞ্চন যোগ হয়েছে—স্থান পবিত্র, দিন পবিত্র এবং পূজ্য সাধুসন্তদের সান্নিধ্যও আমাদের সামনে রয়েছে।
বন্ধুগণ, আমি চৈতন্য মহাপ্রভু, প্রভু নিত্যানন্দ, শ্রীঅদ্বৈত, যিনি মহাবিষ্ণুর রূপ, গদাধর এবং শ্রীবাস—এই সকলকে প্রণাম জানিয়ে আমার বক্তব্য শুরু করতে চাই। আমি যখন এখানে এসেছি, তখন মায়াপুর ধামে ভক্তিসিদ্ধান্ত প্রভুপাদজি এবং ভক্তিবেদান্ত প্রভুপাদজিকেও অন্তর থেকে প্রণাম জানিয়ে আমার বক্তব্য শুরু করছি। কারণ এই দুই মহাপুরুষই শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু যে ভক্তি আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তাকে শুধু এগিয়ে নিয়ে যাননি, আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত করে যুবসমাজ এবং সমগ্র বিশ্বের আত্মার কল্যাণের পথ প্রশস্ত করেছেন।
শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু স্বল্প জীবনকালেই দেশ-বিদেশের বহু অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত আত্মার উদ্ধারের জন্য ভক্তির পথ দেখিয়েছেন। মানুষের মধ্যে গুণ-অপগুণ, ভালো-মন্দ সবই থাকে। কিন্তু যখন কোনও ব্যক্তি নিজেকে শ্রীকৃষ্ণময় করে তোলে, তখন সবই শুভ হয়ে যায়।
এই পথেই শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু কীর্তন, নৃত্য, ভক্তিসঙ্গীত এবং গীতার গভীর বার্তা সহজভাবে পূর্ব ভারত, উত্তর-পূর্ব পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন এবং বহু অজ্ঞ মানুষের জীবনে ভক্তির আলো জ্বালিয়েছেন। এবং সেই আন্দোলনকে ভক্তিসিদ্ধান্ত প্রভুপাদ এবং ভক্তিবেদান্ত প্রভুপাদ আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন।
আজ অত্যন্ত পবিত্র দিন। চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রিয় সেনাপতি এবং গৌড়ীয় মঠের প্রতিষ্ঠাতা, যাঁকে আমাদের গুজরাতে যুগাচার্যও বলা হয়—শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদের আজ ১৫২তম জন্মজয়ন্তী। আপনারা সকলেই শ্রীকৃষ্ণ, ভগবান নৃসিংহ এবং শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদের গুণগান করতে এখানে এসেছেন।
আমিও আজ বহুদিনের অপেক্ষার পর এই পবিত্র স্থানে এসে আমার চেতনাকে জাগ্রত করার সুযোগ পেয়েছি। এজন্য আমি মঠের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
একজন ব্যক্তি যদি জীবনে একশো কোটি বার শ্রীকৃষ্ণ নাম জপ করার সংকল্প নেন, সেটাই বড় কথা। কিন্তু সেই সংকল্পকে জীবনে পূর্ণ করা আরও বড় কথা—যা ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর সম্পূর্ণ করেছিলেন। এটি বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ।
শ্রীকৃষ্ণের নাম একবার ভক্তিভাবে স্মরণ করলেও চেতনা জাগ্রত হয়, শক্তি লাভ হয়, অজ্ঞতার অন্ধকার দূর হয়। তাহলে কল্পনা করা যায়, যিনি এক জীবনে একশো কোটি বার নাম জপ করেছেন, তিনি নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ শ্রীকৃষ্ণময় করে তুলেছিলেন। তিনি গৌড়ীয় মঠের মাধ্যমে সেই পথ সকলের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি ধর্মকে নানা কুসংস্কার ও রীতিনীতি থেকে মুক্ত করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন যে আধুনিকতা ধর্মের শত্রু নয়, বরং সহযোগী।
একসময় মুদ্রণযন্ত্রকে নিষিদ্ধ মনে করা হত। কিন্তু তিনি একে ‘বৃহৎ মৃদঙ্গ’ নামে আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন—মৃদঙ্গের শব্দ সীমিত দূরত্বে পৌঁছায়, কিন্তু বই বিশ্বের সর্বত্র ভক্তির বার্তা ছড়াতে পারে। এই ধরনের রীতিভাঙার জন্য গভীর ভক্তি ও দৃঢ় বিশ্বাস প্রয়োজন। তিনি আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে এই আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করেছেন।
আমার জীবনে আমি বহু সাধুসন্তের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কিন্তু একবার আহমেদাবাদের ইস্কন মন্দিরে এক সাধু বলেছিলেন—যখন কেউ তাঁকে প্রণাম করতেন, তিনি বলতেন ‘দাসোস্মি’, অর্থাৎ ‘আমি তোমার সেবক’। এই মনোভাব থাকলে ঈশ্বর কখনো দূরে থাকেন না।
তিনি গুরুর ব্যাখ্যাও সুন্দরভাবে দিয়েছিলেন—যেদিন গুরু ভাবেন ‘আমি গুরু’, সেদিন ‘গুরু’ শব্দ থেকে ‘উ’ বেরিয়ে যায় এবং ‘গরু’ হয়ে যায়। সত্যিকারের গুরু সেই, যিনি শিষ্যকে উন্নত করেন, তার জ্ঞান ও চেতনা বৃদ্ধি করেন।
আমি আজ ভক্তিসিদ্ধান্ত প্রভুপাদকে প্রণাম জানিয়ে বলতে চাই—আপনি প্রকৃত গুরু ছিলেন। তিনি জাতিভেদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। মহাভারতের পর প্রথমবার তিনি যাঁরা জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ নন, তাঁদেরও উপনয়ন দিয়ে ব্রাহ্মণ হওয়ার অধিকার দিয়েছেন।
তিনি ‘যুক্ত বৈরাগ্য’-র ধারণা দিয়েছেন—সংসার ত্যাগ নয়, বরং সবকিছুকে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় লাগানোই বৈরাগ্য। তিনি ছিলেন এক যুগদ্রষ্টা মহাপুরুষ। আজ আমি এখানে এসে মায়াপুরে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক কেন্দ্র দেখে অভিভূত। আমি বলতে চাই—এই কেন্দ্র ভবিষ্যতে বিশ্বকল্যাণের একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে। এই কেন্দ্র যুগের পর যুগ ভক্তির বার্তা প্রচার করবে।
ভক্তিসিদ্ধান্ত প্রভুপাদ ভক্তিবেদান্ত প্রভুপাদের মতো শিষ্য গড়ে তুলেছিলেন, যার ফলে আজ ইস্কন আন্দোলন বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। মতুয়া সমাজও সমাজকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুর সমাজকে একত্রিত করেছেন।
ইস্কনের অন্যতম বড় অবদান হল গীতার বার্তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। দেশের সব ভাষায় গীতা পাওয়া যায় আর সেটা ইস্কন ছাপিয়েছে।
স্কুলের পড়ুয়া, যুবসমাজ, গৃহিণী—সকলেই গীতার থেকে অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন। এই কাজ ইস্কন করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি বিশ্বনেতাদের গীতা উপহার দেন, কারণ এর মধ্যে বিশ্বকল্যাণের বার্তা রয়েছে।
ইস্কন শুধু ভক্তি নয়, সেবার ক্ষেত্রেও বিশাল কাজ করেছে—দুর্যোগে খাদ্য বিতরণ, হাসপাতাল, শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই তারা কাজ করছে। আজ আমি ভগবান নৃসিংহের সামনে দেশের কল্যাণের প্রার্থনা করে এসেছি। আমি বিশ্বাস করি, ২০৪৭ সালের মধ্যে আমরা ‘বিকশিত ভারত’ গড়ে তুলতে এবং সনাতন ধর্মের বার্তা বিশ্বে পৌঁছে দিতে সফল হব। এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য গৌড়ীয় মঠকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
বক্তৃতার শুরুতে অমিত শাহ বলেন, পবিত্র মায়াপুরের ভূমিতে আমার সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত পূজ্য গৌরাঙ্গ প্রেম স্বামীজি মহারাজ, সভাপতি ইস্কন নামহট্ট, পূজ্য যুধিষ্ঠির গোবিন্দ প্রভু, পূজ্য ভক্তি বেদান্ত জনার্দন স্বামীজি মহারাজ, সভাপতি গৌড়ীয় বৈষ্ণব সংঘ, পূজ্য ভক্তি বৈভব নারায়ণ স্বামী মহারাজ, সম্পাদক সারস্বত গৌড়ীয় বৈষ্ণব সংঘ।
মোদীজির মন্ত্রীপরিষদে আমার সহকর্মী শ্রদ্ধেয় ভূপেন্দ্র যাদব, ভারতীয় জনতা পার্টির প্রবীণ নেতা এবং বাংলার বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতা শ্রদ্ধেয় শুভেন্দু অধিকারী, আমার বন্ধু এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও রাজ্যসভার সাংসদ শ্রদ্ধেয় শমীক ভট্টাচার্য এবং আজ এই পবিত্র দিন উপলক্ষে দেশজুড়ে এবং সমগ্র বাংলা থেকে আগত সকল ভক্তজনকে আমার ‘হরে কৃষ্ণ’।
সর্বপ্রথম আজ সকালে আমার দেশের সম্মানীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজির সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি তাঁকে বলেছিলাম যে আজ আমি সরস্বতী ঠাকুর মহারাজের ১৫২তম জন্মজয়ন্তীতে মায়াপুরে যাচ্ছি। তিনি আন্তরিকভাবে আপনাদের সকলকে ‘হরে কৃষ্ণ’ জানিয়েছেন।”
শেষে বলেন, “সবাই আমার সঙ্গে বলুন—
হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।”

