মনিশংকর মুখোপাধ্যায় (Mani Shankar Mukherjee Death), মানে আমাদের শংকরদা (Shankar) চলে গেলেন। একটা দীর্ঘ যুগ ধরে কীভাবে এক ব্যক্তি নিজেই একটা জগৎ হয়ে উঠতে পারেন, সময়বিশেষে তার সামান্য আঁচ পেয়েছি। তাঁর এই চলে যাওয়া তাই আমার মনে ধাক্কা দিল।
গত শতকের আশির দশকের মাঝপর্বে সিইএসসি (CESC)-তে একটা সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়েছি। সম্মেলনের পর ছিল নির্ধারিত ভোজন। কেন জানিনা, মনে হচ্ছিল খবর হিসাবে বোধহয় জুৎসই কিছু পেলাম না সাংবাদিক সম্মেলনে। তুলনায় যেন বেশি সংস্থার প্রচার। শংকরদা সে সময় সংস্থার প্রচারবিভাগের সর্বোময় কর্তা। সাংবাদিকরা যেন ভোজন না সেরে না যান, তাঁর শ্যোনদৃষ্টি সেদিকে। আমি একটু চিন্তত মুখে বলেই ফেললাম, বুঝতে পারছি না খবরটা কী হবে? চকিতে উনি জবাব দিলেন, “আরে , ও সব বাদ দাও! না লিখলে ক্ষতি নেই! না খেয়ে একদম কেউ যাবে না!”
আনন্দবাজার পত্রিকায় আমি সাংবাদিকতা করাকালীন অনেক সময় আমাদের অফিসে আসতেন। গল্প করতেন অনেকের সঙ্গে। মুখে সর্বক্ষণ লেগে থাকা হালকা হাসি— এটা ছিল ওঁর অন্যতম ইউএসপি। এবিপি (ABP)-র সম্পাদক অভীক সরকারও আমাদের বিভাগে তাঁর সঙ্গে বেশ খুশীমনে কথা বলতেন। অদূরে বসে তা লক্ষ্য করতাম। জনসংযোগের দুনিয়ার ব্যস্ততা সামলেও কিভাবে এত বিপুল পরিমাণ লিখতেন, যে কেউ ভেবে অবাক হতেন। জনপ্রিয়তার নিরিখে ‘চৌরঙ্গী’ তাঁর এক অনন্য মাইলফলক—২০১২ সাল পর্যন্ত উপন্যাসটির ১১১তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
(Sharadindu Bandyopadhyay) তাঁকে উৎসাহ দিয়ে লিখেছিলেন—“ব্রাইট, বোল্ড, বেপরোয়া।” এমনকি ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস পড়ে তিনি মন্তব্য করেন, “তোমার এই লেখায় জননী-জন্মভূমিকেই আমি সারাক্ষণ উপলব্ধি করলাম।” চৌরঙ্গী উপন্যাস থেকে তৈরি হয় জনপ্রিয় সিনেমায় মুখ্য চরিত্র স্যাটা বোসের ভূমিকায় অভিনয় করেন মহানায়ক উত্তম কুমার (Uttam Kumar)। এই প্রসঙ্গে শংকর একবার বলেছিলেন, “সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।”
নানা সময়ে, নানা অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। ব্যস্ততার মধ্যেও কখনও উত্তেজিত বা চিন্তিত দেখিনি। শেষ বহু বছর যোগাযোগ ছিল না।
গত ২৮ ডিসেম্বর, রবিবার হঠাৎ বন্ডেল রোডে তাঁর বাড়িতে গিয়েছি বুড়োশিব দাশগুপ্তর সঙ্গে। শংকরদা-র
বোন জানালেন, একদিন আগেই পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। বাইপাস-সংলগ্ন পিয়ারলেস হাসপাতালে (Peerless Hospital) ভর্তি হয়েছেন।
আমরা বুঝেছিলাম, এই বয়সে কোমড়ের হাড়ে কিছু হলে সুস্থ হতে সময় লাগে। তবু ঠিক করলাম, হাসপাতালে গিয়ে দেখা না করে বাড়িতেই আবার আসব। যাচ্ছি, যাব—এইসব দোটানায় যাওয়া হচ্ছিল না। তার মধ্যেই প্রাক্তন কর্মী গৌতম ভট্টাচার্যের বেসবুক পোস্টে জানলাম, শংকরদা আর নেই। চটজলদি জানালাম বুড়োশিবদাকে। শেষ দেখা হল’না আমাদের। ক্রমে শংকরদা-র হরেক স্মৃতিচারণে ভরে উঠতে লাগল সামাজিক মাধ্যম। আস্তে আস্তে বেড়ে চলেছে তার বহর।
আরও পড়ুনঃ https://bengali.newscope.press/in-my-memory-shankarda/

