বর্তমান যুগে যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়াতেও চলে খবরের এক অদৃশ্য লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে প্রায়শই সত্যি-মিথ্যার পার্থক্য করা সাধারণ মানুষের জন্য ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে।
ইজরায়েল (Israel) এবং ইরান (Iran)-এর মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতের মাঝেই সোশ্যাল মিডিয়ায় হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu)-র মৃত্যু এবং অন্তর্ধানের নানা রকম গুজব। তবে এবার এই সমস্ত ভুয়ো খবর বা ফেক নিউজকে কড়া ভাষায় উড়িয়ে দিয়ে আসল সত্যিটা সামনে আনল খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
গত কয়েকদিন ধরে এক্স (X) সহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে একাধিক পোস্টে দাবি করা হতে থাকে যে, ইরানের ভয়াবহ মিসাইল হামলায় জেরুজালেম (Jerusalem)-এ নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন অথবা তিনি গুরুতরভাবে আহত। কেউ কেউ আবার এমন দাবিও করেন যে, তাঁর আসল অবস্থান সম্পর্কে সরকার ইচ্ছে করেই তথ্য গোপন করছে। এই ধরনের পোস্টগুলো ভাইরাল হওয়ার সাথে সাথেই বিশ্বজুড়ে প্রবল চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যখন ইরানের বিভিন্ন মিডিয়া দাবি করে যে তাদের মিসাইল সরাসরি নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে আঘাত হেনেছে, তখন এই জল্পনা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অতি দ্রুত এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই সমস্ত দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং আদ্যোপান্ত ‘ফেক নিউজ’। এক পদস্থ সরকারি আধিকারিক সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, “এগুলো সব ভুয়ো খবর; প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন।”
মৃত্যুর গুজবের পাশাপাশি আরও একটি অদ্ভুত দাবি সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে জরুরি বক্তব্য রাখছিলেন। সেই ভিডিওর একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করে নেটিজেনদের একাংশ দাবি করেন যে, নেতানিয়াহুর ডান হাতে ছ’টি আঙুল দেখা যাচ্ছে! এই ‘ছয় আঙুল’-এর তত্ত্বকে হাতিয়ার করে অনেকেই বলতে শুরু করেন যে, নেতানিয়াহু আসলে জীবিত নেই, এবং এই ভিডিওটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।
আমেরিকার বিখ্যাত রক্ষণশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্যান্ডেস ওয়েন্স (Candace Owens) এই বিতর্কে ঘি ঢেলে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে লেখেন, “কোথায় বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম)? কেন তাঁর অফিস থেকে এই ধরনের ভুয়ো এআই ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে এবং পরে তা ডিলিট করা হচ্ছে? কেন হোয়াইট হাউস (White House)-এ এত আতঙ্ক?” তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ওয়াশিংটন ডিসি (Washington D.C) আমেরিকার জনগণের কাছে আসল সত্যিটা লুকাচ্ছে।
তবে এই সমস্ত দাবি খুব বেশিদিন টিকতে পারেনি। বিশ্বের প্রথম সারির ফ্যাক্ট-চেকাররা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন চ্যাটবট গ্রক (Grok) এই ভিডিওটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে আসল সত্যটা মানুষের সামনে এনেছে।
ফ্যাক্ট-চেকিং রিপোর্টে একেবারে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, ভিডিওটিতে নেতানিয়াহুর হাতে কোনো অতিরিক্ত আঙুল নেই। তিনি যখন পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে নির্দেশ করছিলেন, ঠিক তখনই ক্যামেরার বিশেষ অ্যাঙ্গেল এবং আলোর কারণে একটি ‘অপটিক্যাল ইলিউশন’ বা দৃষ্টি ভ্রম তৈরি হয়েছিল। ভিডিওটি কোনোভাবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি বা বিকৃত নয়। এটি সম্পূর্ণ আসল এবং একটি লাইভ প্রেস কনফারেন্সের অংশ।
নেতানিয়াহুর পুত্র ইয়াইর নেতানিয়াহুকে নিয়েও জল্পনা কম হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত সক্রিয় ইয়াইর গত কয়েকদিন ধরে তাঁর অ্যাকাউন্টে কোনো পোস্ট করেননি। তাঁর এই দীর্ঘ নীরবতাকে অনেকেই নেতানিয়াহুর শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনার একটি বড় প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। বলা হচ্ছিল, পরিবার শোকস্তব্ধ বলেই ইয়াইর চুপ করে আছেন। কিন্তু এই দাবিটিও শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই বিষয়েও সমস্ত জল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছে। আধুনিক সময়ে যুদ্ধ শুধু আর রণাঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই, তা সাইবার স্পেসেও সমানভাবে লড়া হচ্ছে। এই ধরনের ভুয়ো খবরের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোই বিপক্ষের মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। নেতানিয়াহু বর্তমানে নিজের দেশেই রয়েছেন এবং সেখান থেকেই তিনি সামরিক অভিযান ও সরকারি কাজকর্ম পুরোদমে পরিচালনা করছেন।


Recent Comments