নয়াদিল্লি (New Delhi): জ্বালানির দাম নিয়ে দেশজুড়ে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর অবশেষে বড়সড় পদক্ষেপ করল কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার পেট্রোল এবং ডিজেলের উপর প্রতি লিটারে ১০ টাকা করে উৎপাদন শুল্ক কমানোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের এই নতুন নির্দেশিকার পর পেট্রোলের উপর কেন্দ্রীয় করের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ টাকা প্রতি লিটার। অন্যদিকে, ডিজেলের উপর বর্তমানে আর কোনো উৎপাদন শুল্ক থাকছে না, অর্থাৎ তা সম্পূর্ণ রূপে শূন্যে নেমে এসেছে।
সাধারণ মানুষের কাছে এই খবর প্রথম দর্শনে অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, বাস্তব চিত্রটা একটু অন্যরকম। সারা দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরো বিক্রয়মূল্য বেশিরভাগ জায়গায় প্রায় অপরিবর্তিতই রয়েছে। এমনকি কিছু কিছু শহরে জ্বালানির দাম সামান্য বেড়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, কেন্দ্র সরকার ১০ টাকা শুল্ক কমানোর পরেও কেন পাম্পে গিয়ে ক্রেতাদের আগের দামেই তেল কিনতে হচ্ছে? এর প্রধান কারণ লুকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব বাজারের চরম অস্থিরতার মধ্যে।
বর্তমানে আমেরিকা (America) ও ইজরায়েলের (Israel) সঙ্গে ইরান (Iran) -এর যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব এসে পড়েছে বিশ্বজুড়ে তেলের সাপ্লাই চেইনের উপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচলে প্রবল বাধা সৃষ্টি হওয়ার কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছে। বিশ্ব বাজারের অন্যতম প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুড (Brent Crude) -এর দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে।
ভারতের তিনটি প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা— ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (Indian Oil Corporation), ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (Bharat Petroleum Corporation Limited), এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (Hindustan Petroleum Corporation Limited) আন্তর্জাতিক বাজারের এই ব্যাপক ওঠানামা এবং ডলারের সাপেক্ষে টাকার দামের উপর ভিত্তি করে প্রতিদিন খুচরো তেলের দাম নির্ধারণ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এতটা বেড়ে যাওয়ার ফলে এই সংস্থাগুলি প্রতিটি লিটার পেট্রোল এবং ডিজেল বিক্রিতে প্রায় ৪৮.৮ টাকা করে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। তাই উৎপাদন শুল্ক কমানো হলেও সেই সুবিধা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, বরং সংস্থাগুলির বিপুল আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতেই এই শুল্ক ছাড়ের টাকা সমন্বয় করা হচ্ছে।
আসুন এবার এক নজরে দেখে নেওয়া যাক দেশের প্রধান শহরগুলিতে আজকের পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কত:
কলকাতা (Kolkata)
পেট্রোল: ১০৫.৪১ টাকা প্রতি লিটার
ডিজেল: ৯২.০২ টাকা প্রতি লিটার
দিল্লি (Delhi)
পেট্রোল: ৯৪.৭৭ টাকা প্রতি লিটার
ডিজেল: ৮৭.৬৭ টাকা প্রতি লিটার
মুম্বাই (Mumbai)
পেট্রোল: ১০৩.৫৪ টাকা প্রতি লিটার
ডিজেল: ৯০.০৩ টাকা প্রতি লিটার
চেন্নাই (Chennai)
পেট্রোল: ১০১.২৩ টাকা প্রতি লিটার
ডিজেল: ৯২.৮১ টাকা প্রতি লিটার
বেঙ্গালুরু (Bengaluru)
পেট্রোল: ১০২.৯৬ টাকা প্রতি লিটার
ডিজেল: ৯০.৯৯ টাকা প্রতি লিটার
হায়দ্রাবাদ (Hyderabad)
পেট্রোল: ১০৭.৫০ টাকা প্রতি লিটার
ডিজেল: ৯৫.৭০ টাকা প্রতি লিটার
চণ্ডীগড় (Chandigarh)
পেট্রোল: ৯৪.৩০ টাকা প্রতি লিটার
ডিজেল: ৮২.৪৫ টাকা প্রতি লিটার
উল্লেখযোগ্যভাবে, চেন্নাই শহরে আগের দিনের তুলনায় ডিজেলের দাম ২০ পয়সা এবং পেট্রোলের দাম ১৭ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে, বেঙ্গালুরুতেও পেট্রোলের দামে সামান্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। অন্যান্য মেট্রো শহর যেমন কলকাতা, দিল্লি এবং মুম্বাইয়ের ক্ষেত্রে দাম প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি বা দাম অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টি শুধুমাত্র গাড়িচালক বা বাইক আরোহীদের জন্যই চিন্তার বিষয় নয়। এর সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছে দেশের সাধারণ মুদ্রাস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। পেট্রোল ও বিশেষত ডিজেলের দামের উপর নির্ভর করে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা এবং পণ্য সরবরাহ। ট্রাক ও লরি ভাড়ার ক্ষেত্রে ডিজেলের দাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সরকার ১০ টাকা শুল্ক কমালেও বাজারে যেহেতু তেলের দাম কমল না, তাই শাকসবজি, চাল, ডাল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্রের দাম কমার যে আশা সাধারণ ক্রেতারা করেছিলেন, তা আপাতত অপূর্ণই থেকে গেল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যদি এই শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত না নিত, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপে পেট্রোল পাম্পগুলিতে তেলের দাম আজ আরও ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি হত। অর্থাৎ, শুল্ক কমানোর ফলে দাম না কমলেও, আগামী দিনে যে ভয়ানক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, অন্তত সেই বিপদ থেকে সাময়িক ভাবে রেহাই মিলেছে।


Recent Comments