নিউজস্কোপ বাংলার বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিবেদন: একুশের বিধানসভা এবং চব্বিশের লোকসভার পর এবার রাজনৈতিক দলগুলির পাখির চোখ পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬। নির্বাচনের এখনও বেশ কিছুটা দেরি থাকলেও, শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ ইতিমধ্যেই চরমে পৌঁছেছে। রাজনীতির ময়দান এখন উত্তপ্ত। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) নিশানা করে যে ‘ভিক্টিম কার্ড’ মন্তব্য করেছিলেন, এবার তার কড়া ও বিস্ফোরক জবাব দিল ঘাসফুল শিবির। দলের হয়ে সরাসরি ড্যামেজ কন্ট্রোল এবং পাল্টা আক্রমণের কৌশল নিয়ে ময়দানে নামলেন রাজ্যের মন্ত্রী ও প্রবীণ নেতা ব্রাত্য বসু (Bratya Basu)।
ঠিক কী বলেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?
সম্প্রতি কলকাতা (Kolkata) সফরে এসে বিজেপির (BJP) শীর্ষ নেতৃত্ব রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে একটি ‘চার্জশিট’ বা অভিযোগপত্র প্রকাশ করেন। সেই হাইভোল্টেজ রাজনৈতিক মঞ্চ থেকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে তীব্র আক্রমণ শানান শাহ। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ ছিল:
নির্বাচন এলেই তৃণমূল নেত্রী নাকি ‘ভিক্টিম কার্ড’ বা সহানুভূতির রাজনীতি শুরু করেন।
কখনো পায়ে চোট, কখনো মাথায় ব্যান্ডেজ— অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মানুষের আবেগ আদায়ের সুকৌশলী চেষ্টা করা হয়।
পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় তুলে নিজেদের ব্যর্থতা ও দোষ ঢাকার চেষ্টা করে রাজ্যের শাসক দল।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই তীক্ষ্ণ আক্রমণের পরেই রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিরোধী শিবির যখন এই মন্তব্যকে হাতিয়ার করে প্রচারের আলো কাড়তে চাইছে, ঠিক তখনই এল কড়া প্রত্যাঘাত।
ব্রাত্য বসুর প্রত্যাঘাত: ‘বিচারকের আসনে অপরাধী’
শাহের এই মন্তব্যের পর একচুলও জমি ছাড়তে নারাজ রাজ্যের শাসক দল। অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই অভিযোগের খণ্ডন করেছেন ব্রাত্য। সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কার্যত তুলোধোনা করেন। শাহের প্রকাশ করা চার্জশিটকে তীব্র কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “এই ঘটনা অনেকটা বিচারকের আসনে কোনো অপরাধীর বসে থাকার মতো।”
তিনি আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যোগ করেন, “ভিক্টিম কার্ড কে খেলে, কীভাবে খেলে সেটা আমরা সবাই জানি।” তাঁর স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল গেরুয়া শিবিরের কৌশলের দিকেই। ব্রাত্য মনে করিয়ে দেন, বাংলার মানুষ অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন। ধর্ম বা বিভাজনের রাজনীতি করে, কিংবা ভোটের সময় নিজেদের বঞ্চিত বা আক্রান্ত প্রমাণ করে কারা ফায়দা লোটার চেষ্টা করে, তা রাজ্যবাসীর কাছে আয়নার মতো পরিষ্কার।
পরিসংখ্যানকে হাতিয়ার করে পাল্টা আক্রমণ
ব্রাত্যর এই আক্রমণ কেবল শূন্যগর্ভ কথার কথা ছিল না; তিনি রীতিমতো পরিসংখ্যান তুলে ধরে পদ্ম শিবিরকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন। জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তাঁর যুক্তিগুলি ছিল অত্যন্ত ধারালো:
নারী সুরক্ষায় ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যের ব্যর্থতা: তিনি প্রশ্ন তোলেন, মহিলাদের ওপর অপরাধের নিরিখে উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh), মহারাষ্ট্র (Maharashtra) এবং রাজস্থানের (Rajasthan) মতো রাজ্যগুলো দেশের মধ্যে শীর্ষস্থানে থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কেন একেবারে নিশ্চুপ?
মণিপুর ইস্যুতে স্পিকটি নট: মণিপুর (Manipur) নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দীর্ঘ নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, নিজেদের দলের শাসিত রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা যখন তলানিতে, তখন বাংলায় এসে বড় বড় নীতিবাক্য শোনানো একেবারেই মানায় না।
‘আসল বঞ্চনা করছে কেন্দ্রই’
এই রাজনৈতিক তরজার কেন্দ্রবিন্দুতে ব্রাত্য বসু আরও একটি জ্বলন্ত বিষয় তুলে ধরেন, তা হল— কেন্দ্রীয় বঞ্চনা। রাজ্যের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী, ১০০ দিনের কাজ থেকে শুরু করে আবাস যোজনার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ টাকা আটকে রেখেছে দিল্লি। রাজ্যের মন্ত্রীর দাবি, কেন্দ্র সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের টাকা আটকে রেখে নিম্নরুচির রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিচ্ছে। আর তারপর এ রাজ্যে এসে উল্টে তৃণমূলের বিরুদ্ধেই ভিক্টিম কার্ড খেলার ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে।


Recent Comments