গণতন্ত্রের অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো বিচারব্যবস্থা। কিন্তু সেই বিচারব্যবস্থার রক্ষক বা আধিকারিকরাই যখন সাধারণ মানুষের কাজ করতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হন, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন ওঠে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ [West Bengal]-এর মালদহ [Malda] জেলায় এমনই এক শিউরে ওঠার মতো ঘটনা ঘটেছে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর-এর (SIR) ডিউটিতে থাকা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের শুধু ঘেরাও করাই নয়, তাঁদের ওপর রীতিমতো হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই নজিরবিহীন ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে দেশের শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্ট [Supreme Court]।
রাজ্য প্রশাসনকে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করার পাশাপাশি, বিচারকদের নিরাপত্তায় অবিলম্বে কেন্দ্রীয় বাহিনী [Central Forces] মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।বৃহস্পতিবার সকালে এই সংক্রান্ত মামলার এক জরুরি শুনানি হয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত [Surya Kant], বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী [Joymalya Bagchi] এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলি [Vipul Pancholi]-র নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষ বেঞ্চ এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার কড়া সমালোচনা করেন। শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল [Kapil Sibal], মেনকা গুরুস্বামী, গোপাল শঙ্করনারায়ণন, সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা [Tushar Mehta] এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষের আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু। প্রধান বিচারপতি হতাশা প্রকাশ করে জানান, বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগের দিন গভীর রাতে তাঁকে মৌখিকভাবে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ দিতে হয়েছিল।
ঠিক কী ঘটেছিল মালদহে?
আদালত সূত্রে জানা যায়, মালদহের একটি গ্রামে এসআইআর প্রক্রিয়ার কাজে গিয়েছিলেন সাতজন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক, যাঁর মধ্যে তিনজন মহিলাও ছিলেন। বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ আচমকাই তাঁদের ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে একদল উন্মত্ত জনতা। সবথেকে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই আটকে পড়া আধিকারিকদের সঙ্গে একটি পাঁচ বছরের শিশুও ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তাদের সামান্য খাবার বা জলটুকুও দেওয়া হয়নি!পরিস্থিতি এতটাই হাতের বাইরে চলে যায় যে, কলকাতা হাইকোর্ট [Calcutta High Court]-এর প্রধান বিচারপতিকে স্বয়ং হস্তক্ষেপ করতে হয়।
রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেন তিনি। অবশেষে মধ্যরাতের পর, ১২টার দিকে ওই আধিকারিকদের মুক্ত করা সম্ভব হয়। কিন্তু ফেরার পথেও রেহাই মেলেনি তাঁদের। অভিযোগ, তাঁদের গাড়িতে পাথর ছোড়া হয় এবং বাঁশ দিয়ে হামলা চালানো হয়।এই ঘটনায় রাজ্য প্রশাসনের চরম গাফিলতি ও “অপরাধমূলক ব্যর্থতা”-র দিকে সরাসরি আঙুল তুলেছে শীর্ষ আদালত। আদালত নিজেদের নির্দেশে উল্লেখ করেছে যে, রাত আটটা-সাড়ে আটটা পর্যন্ত প্রশাসনের তরফ থেকে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। এমনকি রাজ্যের মুখ্যসচিব [Chief Secretary], পুলিশের ডিজি বা ডিজিপি [DGP], জেলার পুলিশ সুপার বা এসপি [SP] এবং জেলাশাসক [District Collector]-এর মতো শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয়নি বলে তীব্র আক্ষেপ প্রকাশ করেছে বেঞ্চ।
বিচারপতিদের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়, বরং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত বিচারকদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার এবং সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার একটি সুপরিকল্পিত ও নির্লজ্জ প্রয়াস। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, যারা পবিত্র ও গুরুদায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের মনে মনস্তাত্ত্বিক ভয় তৈরি করার জন্য কাউকেই আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার দেওয়া হবে না।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও বিচারকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের নির্বাচন কমিশন [Election Commission of India]-কে অবিলম্বে পর্যাপ্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী চেয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেখানে যেখানে এসআইআর-এর কাজ চলছে, সেখানেই এই বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। পাশাপাশি, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে গোটা তদন্তভার সিবিআই [CBI] অথবা এনআইএ [NIA]-এর মতো কোনও স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।কর্তব্যে অবহেলার কারণে রাজ্যের মুখ্যসচিব, ডিজি, জেলাশাসক এবং এসএসপি-কে শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামী ৬ এপ্রিল বিকেল ৪টের সময় তাঁদের অনলাইনে সশরীরে উপস্থিত থেকে জবাবদিহি করতে বলা হয়েছে। এছাড়া, ডিউটিতে থাকা কোনও বিচারকের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ন্যূনতম শঙ্কা থাকলেও, অবিলম্বে তার মূল্যায়ন করে কড়া পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


Recent Comments