ইতিহাসের বোধহয় নিজস্ব এক অদ্ভুত রসবোধ রয়েছে। যে দলটির জন্ম হয়েছিল এক দশকেরও বেশি পুরনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে, এবং বিশেষ করে কংগ্রেসের পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, আজ সেই দলটিই ক্ষমতার অলিন্দে নিজেদের এক দুর্ভেদ্য পারিবারিক দুর্গ তৈরি করে বসে আছে । দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিবারতন্ত্র বা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এক অদ্ভুত ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে কাজ করে । এই অঞ্চলে রাজনৈতিক দলগুলো নিছক কোনো আদর্শগত জোট নয়; বরং এরা এমন এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, যারা সুনির্দিষ্ট পারিবারিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই এবং রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে । এই একই পথ, বরং বলা ভালো আরও নিখুঁত ও মসৃণ পথ অনুসরণ করেছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস বা টিএমসি ।
১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC) থেকে বেরিয়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন এই দলের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তাঁর মূল পুঁজি ছিল বামফ্রন্টের দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে এক তীব্র, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী এবং জনমোহিনী রাজনৈতিক বাগ্মীতা । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে এমন একজন নেত্রী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যিনি ‘রাজনৈতিক সন্ন্যাস’-এর এক মূর্ত প্রতীক । তাঁর অনাড়ম্বর জীবনযাপন, এবং রাজপথের লড়াকু মেজাজ বাংলার সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের সাথে তাঁর এক আত্মিক সংযোগ স্থাপন করেছিল । তিনি দশকের পর দশক ধরে বাংলার ভোটারদেরই তাঁর একমাত্র ‘পরিবার’ হিসেবে দাবি করে এসেছেন, বোঝাতে চেয়েছেন তাঁর আপন বলতে এই আমজনতা ছাড়া আর কেউ নেই । এই হিসেবি সন্ন্যাসী-মূর্তি তাঁকে তাঁর পুরনো দল কংগ্রেসের গভীর পরিবারতান্ত্রিক সংস্কৃতির থেকে আলাদা করেছিল । একইসঙ্গে, এটি তাঁকে স্বজনপোষণের সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত রেখে বিরোধীদের বিরুদ্ধে এক প্রবল নৈতিক উচ্চভূমিতে স্থাপন করেছিল ।
কিন্তু ক্ষমতা এক অদ্ভুত জাদুকর; সে নিরাকার আদর্শকে খুব দ্রুত সাকার আত্মীয়তায় পরিণত করতে পারে। ২০১১ সালে বাম দুর্গের পতনের পর তৃণমূল যখন রাজ্যের অবিসংবাদিত শাসকদলে পরিণত হলো, তখন থেকেই শুরু হলো এক কাঠামোগত রূপান্তর । এক সময়ের বিক্ষুব্ধ আঞ্চলিক বিরোধী শক্তি আজ এক বিশাল শাসকযন্ত্র, যেখানে পারিবারিক নেটওয়ার্ক এবং প্রকাশ্যে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার দলের মূল সাংগঠনিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে । অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (ADR)-এর তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় কংগ্রেসের মতো দলে যেখানে বসে থাকা বিধায়কদের ৩২% রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসে, সেখানে তৃণমূলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রায় ১০ শতাংশই কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিবারের অংশ । সংখ্যাটা শুনতে কম লাগলেও, একেবারে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে স্থানীয় পুরসভার অত্যন্ত লাভজনক পদগুলোতে এই ১০ শতাংশই যে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে বসে আছে, তা এক অত্যাশ্চর্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বজনপোষণেরই প্রমাণ ।
পিসি-ভাইপো সমীকরণ: উত্তরাধিকারের “ডাইন্যাস্টিক ডিলেমা” বা বংশানুক্রমিক দ্বিধা
যেকোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন যখন আঞ্চলিক স্তরে চরম ক্ষমতা ভোগ করে, তখন একদিন না একদিন তাকে উত্তরাধিকারের অনিবার্য সঙ্কটের মুখোমুখি হতেই হয় । তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং সাংগঠনিক ভরকেন্দ্র নিঃসন্দেহে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কের দ্বারা সংজ্ঞায়িত । এক ক্যারিশম্যাটিক নেত্রীর ওপর নির্ভরশীল দলের এই দুর্বলতা ঢাকতেই একটি দ্বিতীয় ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল ।
উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়া কিন্তু কোনো কাঁচা হাতের কাজ ছিল না; এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এক চিত্রনাট্য । ২০১১ সালের জুলাই মাসে, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল যুব কংগ্রেসের (TMYC) সর্বভারতীয় সভাপতি করা হয় । এটি ছিল এক নিপুণ রাজনৈতিক চাল । দলের যে প্রবীণ নেতারা নিজেদের এলাকায় এক একজন ‘ওয়ারলর্ড’ বা যুদ্ধপতি হয়ে বসেছিলেন, তাঁদের এড়িয়ে গিয়ে অভিষেক যুব কংগ্রেসের মাধ্যমে নিজের এক একান্ত অনুগত, সমান্তরাল ক্যাডার বাহিনী তৈরি করেন । বলা যায়, দলের ভেতরেই তিনি নিজের একটি ‘স্টার্টআপ’ খুলে বসেছিলেন । ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করা হয় । নিরাপদ এই আসন থেকে জিতে তিনি নিজেকে রাজ্য প্রশাসনের দৈনন্দিন কাদা-ছোঁড়াছুড়ি থেকে সরিয়ে লোকসভার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করেন ।
এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে দলের বিপুল জয়ের পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে উন্নীত করা হয় । সুব্রত বক্সীর মতো প্রবীণ নেতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের ‘ডি ফ্যাক্টো’ বা অঘোষিত দ্বিতীয় প্রধান হিসেবে আবির্ভূত হন । প্রার্থী নির্বাচন, রাজনৈতিক পরামর্শদাতাদের পরিচালনা—সব কিছুর রিমোট কন্ট্রোল চলে আসে তাঁর হাতে ।
তবে এই রাজমুকুট পরার পথে একটা কাঁটা ছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “ডাইন্যাস্টিক ডিলেমা” বা বংশানুক্রমিক দ্বিধা । একদিকে উত্তরাধিকারীকে মূল নেতার মতোই অসাধারণ ও ক্যারিশম্যাটিক হিসেবে প্রমাণ করতে হয়, অন্যদিকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সুবিধাকে প্রাণপণে আড়াল করতে হয় । ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী লুই দুমঁ একে “শেমফেসডনেস (shamefacedness)” বলেছেন, কারণ গণতান্ত্রিক কাঠামোতে বিনা পরিশ্রমে পাওয়া ক্ষমতাকে মানুষ ভালো চোখে দেখে না ।
এই দ্বিধা কাটানোর জন্য অভিষেক এক অপূর্ব কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, পিসির দৌলতে নয়, তিনি ঘাম ঝরিয়েই নেতা হয়েছেন । নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) সময় যখন বিতর্ক ওঠে, তখন অভিষেক নিজেই ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে দিল্লিতে পৌঁছান । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদের কালো শালের সাথে নিখুঁতভাবে মিলিয়ে তিনি একটি কালো সোয়েটার পরে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ‘তীব্র সংগ্রাম’ করেন এবং ভুলবশত মৃত ঘোষণা করা ১২টি পরিবারের হয়ে সওয়াল করেন । এইভাবে তিনি নিজের উত্তরাধিকারকে রাজনৈতিক লড়াইয়ের মোড়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন । বর্তমানে দলের কাঠামোটি এমন দাঁড়িয়েছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন ক্যারিশমা এবং আবেগের মুখ, আর অভিষেক হলেন দলের শৃঙ্খলা ও অপারেশনের নিশ্ছিদ্র নিয়ন্ত্রক ।
দ্বিতীয় স্তরের স্বজনপোষণ: সাংসদ ও বিধায়কদের পারিবারিক দুর্গ
ক্ষমতার শীর্ষে যেমন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের একাধিপত্য, ঠিক তেমনই দলের দ্বিতীয় স্তরেও—সাংসদ, বিধায়ক এবং রাজ্য মন্ত্রিসভায়—পারিবারিক নেটওয়ার্কের এক সুগভীর নির্ভরতা রয়েছে । এই কৌশলটি আসলে স্থানীয় স্তরে নিজেদের দুর্গ সুরক্ষিত রাখা এবং মৃত বা দলত্যাগী নেতাদের রাজনৈতিক পুঁজিকে সস্তায় গিলে খাওয়ার এক নিপুণ উপায় ।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ৪২ জন প্রার্থীর তালিকায় অন্তত পাঁচজন প্রার্থী সরাসরি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছেন । এর কয়েকটি অত্যন্ত মজাদার উদাহরণ হলো:
- মালা রায় (কলকাতা দক্ষিণ): এই মর্যাদাপূর্ণ কেন্দ্রের সাংসদ মালা রায়ের রাজনৈতিক কেরিয়ার যেন তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কেরই এক রাজনৈতিক সম্প্রসারণ ।
- তিনি প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং প্রাক্তন বিধায়ক নির্বেদ রায়ের স্ত্রী ।
- ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি ৮৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন এবং কলকাতা পৌরসংস্থার (কেএমসি) চেয়ারপার্সনের মতো ক্ষমতাশালী পদও সামলেছেন । পুরসভার জমিদারি থেকে সোজা লোকসভার রাজদরবারে উত্তরণের এক নিখুঁত উদাহরণ ।
একইভাবে “বিধবা উত্তরাধিকার” বা ‘উইডো সাকসেশন’-এর এক চরম বাস্তবধর্মী প্রয়োগ দেখা যায় উলুবেড়িয়া কেন্দ্রে ।
- সাজদা আহমেদ (উলুবেড়িয়া): তিনি প্রয়াত সুলতান আহমেদের স্ত্রী ।
- সুলতান আহমেদ ছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী এবং উলুবেড়িয়া অঞ্চলে প্রবল ক্ষমতার অধিকারী ।
- তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে দল শোকের পরিবেশকে সুচারুভাবে ভোটে পরিণত করতে সাজদা আহমেদকে প্রার্থী করে ।
- শুধু তাই নয়, সুলতান আহমেদের ভাই ইকবাল আহমেদকেও দলের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে জায়গা দেওয়া হয়, যাতে এলাকায় পরিবারের রাজত্ব অটুট থাকে ।
বিধানসভা স্তরেও এই একই নাটক দৃশ্যমান। মেদিনীপুরের সবংয়ে মন্ত্রী মানস রঞ্জন ভূঁইয়া যখন রাজ্যসভায় গেলেন, তখন তাঁর ফাঁকা হওয়া আসনে দল তাঁর স্ত্রী গীতা রানী ভূঁইয়াকে প্রার্থী করে দিল । তিনি এক লক্ষেরও বেশি ভোটে জয়লাভ করেন । যেন বিধায়কের পদটি কোনো সরকারি দায়িত্ব নয়, বরং বসার ঘরের একটি সোফা—স্বামী উঠে গেলে স্ত্রী সেখানে বসে পড়েন! আবার কোচবিহারের দিনহাটায় বামফ্রন্টের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মন্ত্রী প্রয়াত কমল গুহর ছেলে উদয়ন গুহ ২০১৫ সালে তৃণমূলে যোগ দিলে, দল তাঁকে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের মতো দপ্তরের মন্ত্রী করে দেয় । সবচেয়ে হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয় বেহালায়। কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় যখন সাময়িকভাবে বিজেপিতে যোগ দিলেন, তখন তাঁর স্থানীয় প্রভাব খর্ব করতে তৃণমূল খোদ শোভনের বিচ্ছিন্ন স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়কে বেহালা পূর্ব থেকে প্রার্থী করে বসিয়ে দিল । পারিবারিক কলহকে কীভাবে নির্বাচনী অস্ত্রে পরিণত করতে হয়, তৃণমূল তা দেখিয়ে দিয়েছে ।
ক্রীড়া জগৎ: ময়দানে ‘দাদাদের’ দাপট
পরিবারতন্ত্র কেবল নির্বাচনী টিকিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাজ্যের প্রশাসনিক যন্ত্রপাতি এবং বিশেষ করে ক্রীড়া জগতেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে । পশ্চিমবঙ্গে ফুটবল প্রশাসন অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ক্ষেত্র । ২০১১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে রাজ্য সরকার ক্রীড়া পরিকাঠামো উন্নয়নে ১৮.৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যার মধ্যে ইস্টবেঙ্গল (৭.৬ কোটি), মহামেডান (৫.৫৬ কোটি) এবং মোহনবাগান (৫.৩ কোটি) বিপুল অর্থ পেয়েছে ।
এই বিশাল অর্থের ওপর নজরদারি রাখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজের ভাইদের শীর্ষ ক্রীড়া পদে বসিয়েছেন ।
- তাঁর ভাই অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আইএফএ)-এর সভাপতি এবং ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটিতে বসানো হয়েছে ।
- আরেক ভাই স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে করা হয়েছে মোহনবাগান ক্লাবের ফুটবল সচিব । মনে হয় যেন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের রক্তেই ফুটবলের ম্যারাডোনা লুকিয়ে আছেন!
তবে প্রক্সি শাসনের সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ হলেন স্বরূপ বিশ্বাস ।
- তিনি রাজ্যের বিদ্যুৎ ও ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই ।
- অরূপ বিশ্বাস সাংবিধানিক পদে থাকলেও, স্বরূপ বিশ্বাস আইএফএ-তে অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের একজন ডেপুটি হিসেবে কাজ করেন এবং রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোর ওপর প্রবল ছড়ি ঘোরান ।
- বিশ্বাস পরিবার এভাবেই ক্রীড়া ও বিদ্যুৎ দপ্তরের মতো লাভজনক ক্ষেত্রগুলোর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে ।
- তবে এই লাগামহীন ক্ষমতার পরিণতি কী হতে পারে, তা দেখা যায় ২০২৪ সালের মার্চ মাসে, যখন আয়কর দপ্তর স্বরূপ বিশ্বাসের একাধিক বাসভবনে টানা ৭০ ঘণ্টার তল্লাশি চালায় । রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের সাথে যুক্ত কর ফাঁকি এবং আয়ের বহির্ভূত সম্পত্তি থাকার অভিযোগেই এই অভিযান ।
মাইক্রো-ডাইন্যাস্টি: পুরসভার অলিতে-গলিতে গজিয়ে ওঠা রাজপরিবার
রাজ্য বা জাতীয় স্তরের নেতারা মিডিয়ার নজরে থাকলেও, সবচেয়ে সুপরিকল্পিত স্বজনপোষণ ঘটে পুরসভাগুলোতে । পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পুরসভার ওয়ার্ডগুলোই হলো ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি । পাড়ার সিন্ডিকেট, প্রোমোটিং, রাস্তা সারাই—সবই নিয়ন্ত্রণ করেন কাউন্সিলররা । তাই রাজ্যের মন্ত্রী-বিধায়করা নিজেদের এলাকা অন্য কাউকে ছাড়তে নারাজ।
২০২১ সালের কলকাতা পুরসভা (কেএমসি) নির্বাচনে ১৪৪টির মধ্যে ১৩৪টি ওয়ার্ড জিতে নেওয়ার পেছনে ছিল এই ‘মাইক্রো-ডাইন্যাস্টি’-র এক বিশাল অঙ্ক । মন্ত্রীদের রাগ ভাঙাতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ঢালাওভাবে তাঁদের আত্মীয়দের টিকিট বিলি করে ।
- পূজা পাঁজা: নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজার কন্যা পূজা ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে দিব্যি জিতে আসেন ।
- সৌরভ বসু: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের ছেলে সৌরভও এই নির্বাচনে সফল হন ।
- তনীমা চট্টোপাধ্যায়: প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর বোন তনীমাকে ৬৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে টিকিট দিয়ে পারিবারিক উত্তরাধিকারের ধারা বজায় রাখা হয় ।
- কাকলি সেন: রাজ্যসভার সাংসদ শান্তনু সেনের স্ত্রী কাকলি সেনকেও প্রার্থী করা হয়, যাতে সাংসদ বাবু দিল্লিতে থাকলেও তাঁর পাড়ার রিমোট কন্ট্রোলটি স্ত্রীর হাতে থাকে ।
বিধাননগর পুরনিগমেও এই একই হাস্যকর চিত্র। সেখানকার যুব ও ক্রীড়া দপ্তরের মেয়র-পারিষদ (MMIC) দেবরাজ চক্রবর্তী হলেন রাজারহাট গোপালপুরের বিধায়ক ও জনপ্রিয় গায়িকা অদিতি মুন্সীর স্বামী । স্বামী পুরসভায় ছড়ি ঘোরাচ্ছেন, আর স্ত্রী বিধানসভায়—এ যেন স্বামী-স্ত্রীর এক যৌথ রাজনৈতিক ব্যবসা ।
সোনার কেল্লায় ফাটল?
কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবারতন্ত্র দলের অভ্যন্তরে গভীর ফাটল এবং বিদ্রোহের জন্ম দিচ্ছে । বছরের পর বছর ধরে দলের হয়ে রাস্তায় মার খাওয়া কর্মীরা যখন দেখেন যে, টিকিট পাওয়ার সময় নেতাদের স্ত্রী বা পুত্ররা এসে সেই আসন দখল করে নিচ্ছেন, তখন তাঁদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ে ।
এর ফলে স্থানীয় স্তরে বিদ্রোহ দেখা যায়। হাওড়া জেলা পরিষদের সদস্য মোহিত ঘাঁটির বিদ্রোহ এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ । তিনি দলের মনোনীত প্রার্থী গুলশান মল্লিকের বিরুদ্ধে পাঁচলা বিধানসভা কেন্দ্রে নির্দল হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং সরাসরি ঘোষণা করেন যে তাঁর “লড়াই মল্লিকের বিরুদ্ধে, দলের বিরুদ্ধে নয়” । তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা যেন এলাকাগুলোকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি ভেবে বসে আছেন ।
সবচেয়ে বড় নাটক চলছে ‘ওল্ড গার্ড’ (প্রবীণ নেতা) এবং ‘নিউ গার্ড’ (নবীন প্রজন্ম)-এর মধ্যে । অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর যখন “এক ব্যক্তি, এক পদ” নীতি চালু করার চেষ্টা করলেন, তখন প্রবীণ নেতারা হেসে কুটোপাটি খেলেন । যে দলের আগাগোড়াই “এক পরিবার, সমস্ত পদ” নীতিতে চলে, সেখানে এই ধরনের কর্পোরেট বুলি যে স্রেফ প্রবীণদের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার ছক, তা বুঝতে কারোর বাকি নেই ।
পাশাপাশি, পরিবারের হাতে লাগামহীন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে দুর্নীতির অভিযোগও আকাশছোঁয়া হয়েছে । ইডি এবং আইটি দপ্তর প্রতিনিয়ত তল্লাশি চালাচ্ছে । দমকল মন্ত্রী সুজিত বসুর বাড়িতে পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তল্লাশি চালানো হয়েছে । রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো যখন হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারের কুক্ষিগত থাকে, তখন সেখানে এমন আর্থিক কেলেঙ্কারির পরিবেশ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক । এই হাই-প্রোফাইল দুর্নীতিগুলো কেবল বিজেপিকেই অস্ত্র তুলে দিচ্ছে না, বরং “মা-মাটি-মানুষ”-এর যে আবেগমথিত স্লোগানের ওপর এই দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আজ তা এক নিছক রসিকতায় পরিণত হয়েছে ।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে এগোতে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো বাইরের কোনো বিরোধী দল নয় । তাদের মূল সংগ্রাম হবে দলের নিজস্ব এই পরিবারতান্ত্রিক কাঠামোর অন্দরে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও বঞ্চনাকে সামাল দেওয়া । উত্তরাধিকারের এই ভারী রাজমুকুট শেষ পর্যন্ত তৃণমূলকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে, নাকি সাধারণ কর্মীদের দীর্ঘশ্বাসের ভারে তা ভেঙে পড়বে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র ও সত্যতা যাচাই
| লিঙ্ক (URL) | তথ্যসূত্র বা দাবির প্রেক্ষাপট (Context & Fact Checked Claim) |
|---|---|
| https://doingsociology.org/… | পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে আদর্শগত জোটের বদলে পারিবারিক নেটওয়ার্ক ও ‘দ্বাররক্ষী’ (gatekeeping) প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, তার তাত্ত্বিক ভিত্তি |
| https://www.tandfonline.com/… | দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে “ডাইন্যাস্টিক ডিলেমা” বা বংশানুক্রমিক দ্বিধার বিশ্লেষণ; যেখানে উত্তরাধিকারীদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের তাগিদ থাকে। |
| https://en.wikipedia.org/wiki/Trinamool_Congress | তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা (১ জানুয়ারি ১৯৯৮), বামফ্রন্ট বিরোধী আন্দোলন এবং তৃণমূলের রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রাথমিক তথ্য। |
| https://adrindia.org/… | অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস-এর পরিসংখ্যান যা প্রমাণ করে জাতীয় কংগ্রেসের ৩২%-এর তুলনায় তৃণমূলের ১০% জনপ্রতিনিধি রাজনৈতিক পরিবার থেকে আগত । |
| https://www.researchgate.net/… | মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “রাজনৈতিক সন্ন্যাস” (Political Asceticism) এবং জনমোহিনী ভাবমূর্তির বিশ্লেষণ, যা তাঁকে প্রাথমিকভাবে স্বজনপোষণের অভিযোগ থেকে মুক্ত রেখেছিল । |
| https://akm-img-a-in.tosshub.com/… | ফুটবল ক্লাবগুলোর পরিকাঠামো উন্নয়নে রাজ্যের ১৮.৫৯ কোটি টাকার অনুদান এবং আইএফএ (IFA) ও মোহনবাগানে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইদের (অজিত ও স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়) নিযুক্তির তথ্য। |
| https://www.thehindu.com/elections/… | ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্র থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থিপদ এবং তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি । |
| https://prsindia.org/… | সংসদে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অংশগ্রহণ, কমিটি মেম্বারশিপ এবং বিভিন্ন আইনসভা সংক্রান্ত বিতর্কে তাঁর উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক রেকর্ড । |
| https://www.youtube.com/watch?v=WtDO8OkxCZU | ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) বিতর্কে মৃত ঘোষণা করা পরিবারের সদস্যদের অধিকার রক্ষায় মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচন কমিশনে যাওয়ার ঘটনার প্রমাণ । |
| https://www.thehindu.com/… | ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের অন্তত ১৩ জন প্রার্থীর (যাঁদের মধ্যে ৫ জন সরাসরি প্রভাবশালী) রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসার বিশ্লেষণমূলক সংবাদ। |
| https://www.myneta.info/… | কলকাতা দক্ষিণের সাংসদ মালা রায়ের নির্বাচনী হলফনামা এবং তাঁর স্বামী নির্বেদ রায়ের সাথে রাজনৈতিক সংযোগের প্রমাণ। |
| https://wb.gov.in/… | রাজ্য মন্ত্রিসভায় মানস রঞ্জন ভূঁইয়া, উদয়ন গুহ, অরূপ বিশ্বাস, শশী পাঁজা এবং সুজিত বসুর মতো মন্ত্রীদের সাংবিধানিক পদের সরকারি রেকর্ড। |
| https://www.myneta.info/… | প্রয়াত বামনেতা কমল গুহর ছেলে উদয়ন গুহর নির্বাচনী হলফনামা এবং তৃণমূলে যোগদানের পর দিনহাটা আসন থেকে তাঁর জয়লাভের প্রমাণ। |
| https://www.thehindu.com/… | ক্রীড়া ও বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাসের বাড়িতে কর ফাঁকি এবং আয়ের বহির্ভূত সম্পত্তির দায়ে টানা ৭০ ঘণ্টা আয়কর দপ্তরের (IT) তল্লাশি অভিযানের খবর। |
| https://www.thehindu.com/… | ২০২১ সালের কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে মন্ত্রী ও সাংসদদের আত্মীয়দের (পূজা পাঁজা, সৌরভ বসু, তনীমা চট্টোপাধ্যায়, কাকলি সেন) টিকিট দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য। |
| https://www.anandabazar.com/… | বিধাননগর পুরনিগমের মেয়র-পারিষদ দেবরাজ চক্রবর্তী এবং বিধায়ক অদিতি মুন্সীর দাম্পত্য ও একই এলাকায় যৌথ রাজনৈতিক আধিপত্যের বিবরণ। |
| https://timesofindia.indiatimes.com/… | হাওড়ায় টিকিট না পেয়ে দলের অফিশিয়াল প্রার্থীর বিরুদ্ধে জেলা পরিষদ সদস্য মোহিত ঘাঁটির নির্দল হিসেবে বিদ্রোহ ঘোষণার রিপোর্ট। |

Recent Comments