মধ্যপ্রাচ্যের (Middle East) যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মঙ্গলবার রাতের চরমসীমা যত ঘনিয়ে আসছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ইরান (Iran) সরকারের ওপর চাপ এবং হুমকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, তেহরান (Tehran) যদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত না করে, তবে তাদের দেশের সমস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সেতু এক রাতেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক মহলে এই ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলে সতর্ক করা হলেও, মার্কিন প্রশাসন তা নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।সম্প্রতি ইরান ৪৫ দিনের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, কোনো সাময়িক বিরতি নয়, বরং এই যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির নিশ্চয়তা প্রয়োজন। এর জবাবে ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, মঙ্গলবারের নির্দিষ্ট সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কোনোভাবেই আর সময় বাড়ানো হবে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আগামীকাল রাত ১২টার মধ্যে ইরানের প্রতিটি সেতু ধ্বংস করা হবে এবং সব বিদ্যুৎকেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়া হবে। সেগুলো আর কখনোই ব্যবহারের যোগ্য থাকবে না।”
ট্রাম্পের মতে, সাধারণ ইরানি নাগরিকরা স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্তির স্বাদ পেতে এই সাময়িক কষ্টটুকু সহ্য করতে প্রস্তুত।এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম হুমকির মধ্যেই ময়দানে আরও আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে ইসরায়েল (Israel)। তারা ইতিমধ্যে ইরানের সাউথ পারস (South Pars) এলাকার একটি বিশাল পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। কাতার (Qatar) ও ইরানের মধ্যে থাকা এই বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রটি মূলত ইরানের ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দৈনন্দিন শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস।
পাশাপাশি, ইসরায়েলি হামলায় ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল মজিদ খাদেমি (Majid Khademi) এবং কুদস ফোর্সের আন্ডারকভার ইউনিটের নেতা আসগর বাকেরি (Asghar Bakeri) নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ (Israel Katz) হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তারা ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একে একে খুঁজে বের করে নিশ্চিহ্ন করবেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে যে তারা রাতে তেহরানের তিনটি প্রধান বিমানবন্দর—বাহরাম (Bahram), মেহরাবাদ (Mehrabad) এবং আজমায়েশ (Azmayesh)-এ লাগাতার হামলা চালিয়েছে, যেখানে ইরানি বিমান বাহিনীর বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।অন্যদিকে, ইরান নিজেদের একটি ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব পাকিস্তান (Pakistan)-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের কাছে পাঠিয়েছে। কায়রো (Cairo)-তে নিযুক্ত ইরানের কূটনৈতিক মিশনের প্রধান মোজতবা ফেরদৌসি পোর (Mojtaba Ferdousi Pour) গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তারা আগের আলোচনার সময় দুইবার মার্কিন বোমা হামলার শিকার হয়েছেন।
তাই ট্রাম্প প্রশাসনকে তারা আর বিশ্বাস করতে পারছেন না। পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক (Stephane Dujarric) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, বেসামরিক নাগরিকদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ওপর যেকোনো হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো, বিশেষ করে মিশর, পাকিস্তান এবং তুরস্কের পক্ষ থেকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (Abbas Araghchi) এবং মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ (Steve Witkoff)-এর কাছে যুদ্ধবিরতি এবং প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। শান্তি প্রক্রিয়া চালু রাখতে ওমান (Oman) এবং ইরানি কর্মকর্তারাও জোর কদমে কাজ করছেন। কারণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। পথটি অবরুদ্ধ থাকায় ইতিমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।এই সংঘাতের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলে। লেবানন (Lebanon)-এর রাজধানী বৈরুত (Beirut)-এর পূর্বে আইন সাদেহ (Ain Saadeh) শহরে ইসরায়েলি হামলায় নিরীহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে হিজবুল্লাহ (Hezbollah) বিরোধী এক রাজনৈতিক নেতার বাড়ি লক্ষ্য করে ভয়াবহ বোমা ফেলা হয়।
অন্যদিকে, ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরব (Saudi Arabia) এবং বাহরাইন (Bahrain)-এর সংযোগকারী কিং ফাহদ কজওয়ে (King Fahd Causeway) সতর্কতা হিসেবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।এই দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে ১৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। লেবাননে মৃতের সংখ্যা ১৪০০ ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলে ২৩ জন এবং ১৩ জন মার্কিন সেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি (Mojtaba Khamenei) সম্প্রতি একটি বিরল বিবৃতি প্রকাশ করেছেন, যেখানে তিনি গোয়েন্দা প্রধানের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন।


Recent Comments