নিজস্ব সংবাদদাতা: বাংলা বছরের অন্তিম লগ্নে, চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে মালদা জেলার সাহাপুরে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজার তোড়জোড়। সাহাপুরের তিন নম্বর বিমল দাস কলোনি এবং পাবনা পাড়ায় প্রতিবছরের মতো এবারও জাঁকজমকপূর্ণভাবে এই পূজা পালিত হচ্ছে। উৎসবকে ঘিরে গ্রামজুড়ে তৈরি হয়েছে ভক্তি, আচার এবং লোকসংস্কৃতির এক অপূর্ব আবহ।
চৈত্র সংক্রান্তি, যার অর্থ সঞ্চার বা পরিবর্তন—পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরের আগমনের সীমানারেখা। এই দিনটিকে ঘিরেই বাংলার গ্রামাঞ্চলে পালিত হয় গাজন ও চড়ক পূজা, যা মূলত ভগবান শিবের আরাধনার এক প্রাচীন লৌকিক রীতি। সাহাপুরেও সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সন্ন্যাসীরা এক মাস আগে থেকেই কঠোর ব্রত পালন শুরু করেন। নিরামিষ আহার, উপবাস এবং শিবসাধনার মধ্য দিয়ে তাঁরা নিজেদের প্রস্তুত করেন এই পূজার জন্য।
পূজার আগের দিন পালিত হয় নীল পূজা। এদিন গ্রামের বহু মহিলা উপবাস থেকে পরিবারের মঙ্গল কামনায় শিবের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেন। একই দিনে জল থেকে চড়ক গাছ তুলে এনে নির্দিষ্ট চড়কের মাঠে স্থাপন করা হয়, যা পূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।
চড়ক গাছকে কেন্দ্র করে শুরু হয় উৎসবের মূল আকর্ষণ। সন্ন্যাসী ও ভক্তদের নাচ-গান, পরিক্রমণ এবং ‘হাজরা নাচ’ এই উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ ভিড় জমান এই নাচে অংশ নিতে এবং চড়ক পূজার সাক্ষী হতে।
এবারের চড়ক পূজায় বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে এক ১৪ বছরের কিশোরীর অংশগ্রহণ। প্রথা অনুযায়ী, তাকে পিঠে বঁড়শি ফুঁড়িয়ে চড়ক গাছে ঘোরানো হবে বলে জানা গেছে। এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় কৌতূহল ও চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে, পাশাপাশি পূজার প্রতি মানুষের আগ্রহও বেড়েছে।
চৈত্র সংক্রান্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ‘ছাতু সংক্রান্তি’। এদিন ছাতু, মুড়ি, ছোলা প্রভৃতি খাদ্য গ্রহণের রীতি রয়েছে, যা গরমের শুরুতে শরীরকে সুস্থ রাখার এক প্রাচীন লোকজ জ্ঞান বহন করে। একসময় এই দিনেই বছরের যাবতীয় হিসাব-নিকাশ মিটিয়ে ফেলা হতো এবং পয়লা বৈশাখে নতুন খাতা খোলার মাধ্যমে শুরু হতো নতুন বছরের যাত্রা—যা আজও ‘হালখাতা’ প্রথায় টিকে আছে।
সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রামে বসে মেলা, যেখানে নাচ, গান, যাত্রা ও নানা লোকজ সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে। এই মেলাগুলি শুধু বিনোদনের ক্ষেত্র নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
সব মিলিয়ে, সাহাপুরের তিন নম্বর বিমল দাস কলোনি ও পাবনা পাড়ার চড়ক পূজা এবং চৈত্র সংক্রান্তি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐক্যের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। পুরনো বছরের ক্লান্তি ঝেড়ে নতুন বছরের আশাকে বরণ করার এই উৎসব আজও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন।

Recent Comments