পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ মোটের ওপর শান্তিতেই মিটেছে। তবে রাজনৈতিক মহলের নজর এখন আগামী ২৯ এপ্রিলের দ্বিতীয় দফার হাই-ভোল্টেজ নির্বাচনের দিকে। এই দফায় রাজ্যের দক্ষিণবঙ্গের মোট ১৪২টি আসনে ভাগ্য নির্ধারণ হতে চলেছে। আর এই মেগা লড়াইয়ের ঠিক আগেই এক বিরাট চমক দিল নির্বাচন কমিশন । শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করেই ক্ষান্ত থাকছে না তারা, এবার দুষ্কৃতীদের মনে সরাসরি ত্রাস সৃষ্টি করতে যোগীরাজ্য উত্তরপ্রদেশ থেকে আনা হচ্ছে এক দুঁদে আইপিএস (IPS) অফিসারকে।
কমিশনের প্রকাশিত নতুন ১১ জন পুলিশ পর্যবেক্ষকের তালিকায় একেবারে প্রথম নামটিই হলো অজয় পাল শর্মা (Ajay Pal Sharma)। তাঁকে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাসতালুক বলে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনার (South 24 Parganas) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কে এই ‘সিংহম’ আইপিএস?
অজয় পালের ব্যক্তিগত ও পেশাদারি জীবনের প্রোফাইল ঘাটলে যে কেউই চমকে উঠতে বাধ্য। তিনি আদতে ২০১১ সালের উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের একজন আইপিএস অফিসার হলেও, তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মেরুতে। পাঞ্জাবের লুধিয়ানার ভূমিপুত্র অজয় পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। পাটিয়ালার সরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডেন্টাল সার্জারি বা বিডিএস পাশ করার পর তিনি ডাক্তারি পেশা ছেড়ে পুলিশের উর্দি গায়ে তুলে নেন।
বর্তমানে তিনি প্রয়াগরাজের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পদে কর্মরত রয়েছেন। উত্তরপ্রদেশের গ্যাংস্টার ও অপরাধীদের দমন করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা পুলিশ প্রশাসনে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাঁর চরম কড়া মেজাজ, আপসহীন মনোভাব এবং নির্ভীক দাপটের জন্যই তাঁকে ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ উপাধি দেওয়া হয়েছে।
কেন এই জেলাকে বেছে নিল কমিশন?
নিউজস্কোপ বাংলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপের নেপথ্যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রণকৌশল লুকিয়ে রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় (Bhangar), ক্যানিং (Canning), মিনাখাঁ কিংবা বাসন্তীর মতো এলাকাগুলো বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং বোমাবাজির ভরকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিরোধীদের তরফ থেকে এই জেলা নিয়ে বারবার রিগিং, ছাপ্পা ভোট এবং ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ জমা পড়েছে কমিশনে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে অজয় পালের মতো একজন কড়া ধাঁচের অফিসারকে পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠিয়ে কমিশন আসলে দুষ্কৃতীদের কড়া বার্তা দিতে চাইছে। এর সোজা অর্থ হলো, ভোটের দিন সামান্যতম অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করলেই চরম ব্যবস্থার মুখে পড়তে হবে।
শাসকদলের তীব্র আপত্তি ও রাজনৈতিক চাপানউতোর
কমিশনের এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছে রাজ্যের শাসকদল। ঘাসফুল শিবিরের প্রশ্ন, একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একজন ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ আনার যৌক্তিকতা কোথায়? তাদের দাবি, কমিশন কি আগাম ধরে নিয়েছে যে এই জেলায় এমন কোনো চরম পরিস্থিতি তৈরি হবে যার জন্য এই ধরনের অফিসার প্রয়োজন? নাকি বিরোধী দলের হয়ে সাধারণ ভোটারদের মনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতেই এই সুপরিকল্পিত ছক কষা হয়েছে?
শাসকদলের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বিরোধীরা পালটা দাবি করেছে যে, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে কমিশনের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী। সব মিলিয়ে, দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে ‘সিংহম’ অফিসারের এন্ট্রি রাজ্য রাজনীতির উত্তাপ একধাক্কায় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেখার, এই হাই-প্রোফাইল পুলিশ কর্তার উপস্থিতিতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভোটচিত্র কতটা শান্তিপূর্ণ থাকে।

Recent Comments