
অশোক সেনগুপ্ত
সংবাদমাধ্যমে লাগাতার শিরোনাম এসআইআর। বিভিন্ন দৈনিকে একগুচ্ছ খবর। ছোটপর্দায় দিনভর আলোচনা। বিষয়টা সম্পর্কে অনেকের গভীরতা যথেষ্ঠ নয়। তাই প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে একটা আলোকপাত।
প্রশ্ন—কতবার ভারতে এসআইআর হয়েছে?
উঃ—১৯৫১ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দেশে আট বার।
প্রশ্ন— কোন আইনের বলে?
উঃ— ভারতের নির্বাচন কমিশন, সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের ২১নম্বর ধারায় ৯টি রাজ্য ও ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। এক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধি আইন এবং ১৯৬০ সালের নির্বাচকদের নিবন্ধন সংক্রান্ত নিয়মাবলী অনুসারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন— এবারের এসআইআর কবে থেকে হচ্ছে?
উঃ— প্রথম পর্বে ২০২৫-এ হয়েছে বিহারে।
দ্বিতীয় পর্বের এসআইআর ’২৫-এর ৪ নভেম্বর থেকে দেশের ৯টি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, গোয়া, গুজরাট, কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, তামিলনাড়ু ও উত্তরপ্রদেশে হচ্ছে। এই ৯ রাজ্যে ৩২১টি জেলায় ১,৮৪৩টি বিধানসভা কেন্দ্রের ৫১ কোটি ভোটদাতা এই কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। সঙ্গে ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল — আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, লাক্ষাদ্বীপ ও পুদুচেরিতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রশ্ন— ক’টি ধাপে হচ্ছে এসআইআর?
উত্তর— তিন ধাপে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে— প্রাক এনুমারেশন, এনুমারেশন এবং এনুমারেশন-পরবর্তী পর্যায়।
প্রশ্ন— ধাপ, বা পর্বগুলো কিরকম?
উত্তর—প্রাক এনুমারেশন পর্বে রয়েছে, বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও), নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক (ইআরও) এবং অন্যান্যদের প্রশিক্ষণ। আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে পুরো প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা।
প্রশ্ন—এনুমারেশন পর্বটা কিরকম ছিল?
উত্তর— বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম বিতরণ, সংগ্রহ এবং মিলিয়ে দেখার কাজ হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রতিটি কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ১২০০ ভোটারের সংখ্যানির্ধারণের বিষয়টিও চূড়ান্ত হয় এই পর্বে।
প্রশ্ন— এর পর?
উত্তর— এনুমারেশন-পরবর্তী পর্যায়ে রয়েছে, খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ, যাঁদের নাম মেলেনি তাঁদের নোটিস পাঠানো, দাবি এবং আপত্তি সংক্রান্ত শুনানি (সব ঠিক থাকলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি) এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ।
প্রশ্ন—পুরো প্রক্রিয়ায় কত কর্মী লাগানো হয়েছে/হচ্ছে?
উত্তর— যাতে নির্বাচকমণ্ডলির সুবিধা অনুসারে যথাযথভাবে সম্পন্ন করা যায় তার জন্য ৫ লক্ষ ৩০ হাজারের বেশি বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও, ৭ লক্ষ ৬৪ হাজারের বেশি বুথ লেভেল এজেন্ট, ১০,৪৪৮ জন ইআরও এবং এইআরও ও ৩২১ জন ডিইও-কে কাজে লাগানো হয়েছে (সূত্র—পিআইবি, ৪-১১-২০২৫)।
প্রশ্ন— এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপারটা কিরকম?
উঃ— ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা সাড়ে সাত কোটিরও বেশি। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯ জন ভোটারের জন্য এর দ্বিগুণ সংখ্যক ফর্ম ছাপানো হয়েছে।
প্রশ্ন— এই রাজ্যে শেষ এসআইআর কবে হয়েছিল?
উত্তর— ২০০২ সালে।
প্রশ্ন—বিএলওর মূল কাজ কী?
উঃ—পুরো কথাটা ‘বুথ লেভেল অফিসার’। তাঁরা ভোটারদের কাছে ইউনিক এনুমারেশন ফর্ম পৌঁছে তথ্যসংগ্রহ করেছেন। ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে এই পর্ব।
প্রশ্ন—এর পরের পর্বগুলো কিভাবে হয়/হচ্ছে?
উত্তর— খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয় ১৬ই ডিসেম্বর ২০২৫। নতুন নাম তোলার জন্য কিংবা আপত্তি জানানোর জন্য ফর্ম জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৯শে জানুয়ারি ২০২৬। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
প্রশ্ন—বিএলএ কাকে বলে?
উঃ—ভোটদাতার পাশে থাকা রাজনৈতিক দলের কর্মী, অর্থাৎ বুথ লেভেল এজেন্ট।
কমিশন জানিয়েছিল, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরফে রাজ্যে ৪১৮০০ বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ-২)-এর নাম নথিভুক্ত হয়েছে। পড়ে অবশ্য সংখ্যাটা বেড়েছে।
প্রশ্ন— শুনানীর জন্য কাদের ডাকা হচ্ছে?
উত্তর— নো ম্যাপিং অর্থাৎ ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায়নি, তাঁদেরই প্রথমে ডাকা হয়েছে। শুনানির দায়িত্বে ছিলেন ERO এবং AERO-রা। শুনানি স্থলে ERO, AERO, মাইক্রো অবজার্ভার এবং সংশ্লিষ্ট ভোটাররা।
প্রশ্ন—‘ম্যাপিং’ কাকে বলে?
উত্তর—শেষ যখন এসআইআর হয়েছিল, তখনের ভোটার তালিকার সঙ্গে চলতি বছরের সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকা মিলিয়ে দেখার কাজ। বর্তমান ভোটার তালিকায় থাকা কোনও ভোটারের বাবা-মায়ের নাম ২০০২ সালের তালিকায় রয়েছে কি না, তা-ও এই পর্যায়ে মিলিয়ে দেখা হয়।
প্রশ্ন— ফর্ম-৭ নিয়ে বহু অশান্তি হয়েছে। কেন?
উত্তর—মৃত বা স্থানান্তরিতদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য এটি পূরণ করা হয়। এই পর্যায়ে নানা কারচুপির চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। কমিশন জানায়, যদি একই ব্যক্তি পাঁচ জনের বেশি নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেন, তবে ইআরও নিজে সেগুলি যাচাই করবেন।
প্রশ্ন— বিএলএ নিজে সেই এলাকার ভোটদাতা হলে, ভোটদাতা হিসেবে ফর্ম-৭ জমা দিতে পারবেন? পারলে কতবার?
উত্তর— পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোনও সংখ্যার সীমা নেই। কিন্তু বিএলএ হিসাবে তিনি দিনে অন্য ভোটারদের সর্বোচ্চ ১০টি ফর্ম-৭ জমা দিতে পারবেন। অনলাইন এবং অফলাইন দু’ভাবেই আবেদন করা যাবে।
প্রশ্ন— ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। কেন? ব্যাপারটা কী?
উঃ— লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি একাধিক কারণে হতে পারে। কোনও ভোটারের সঙ্গে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর বাবা ও মায়ের বয়সের ফারাক যদি ১৫ বছরের কম আর ৫০ বছরের বেশি হয় তাহলে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির আওতায় তাঁদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে৷ নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনকে এই কারণে কমিশন নোটিশ পাঠানোয় হইচই হয়৷
প্রশ্ন—এই বিতর্কের নেপথ্যে রাজনীতি কতটা থাকতে পারে?
উত্তর— মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ক’দিন আগে অভিযোগ করেছেন, ইতিমধ্যে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র অজুহাতে আরও ১ কোটি ৩৬ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। বেছে বেছে নির্দিষ্ট সম্প্রদায় ও বিরোধী ভোটব্যাঙ্ককে টার্গেট করা হচ্ছে। কমিশন অবশ্য দৃঢ়ভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রশ্ন— বিতর্কটা তো আদালতেও গড়িয়েছে?
উঃ— হ্যাঁ। গত ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচাররপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দেয়, ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’র জন্য কাদের শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, সেই তালিকা প্রকাশ করে জানাতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।
প্রশ্ন— সময়সীমার কাঠামো কিরকম?
উত্তর— খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয় ১৬ই ডিসেম্বর ২০২৫। নতুন নাম তোলার জন্য কিংবা আপত্তি জানানোর জন্য ফর্ম জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৯শে জানুয়ারি ২০২৬। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
প্রশ্ন—একনজরে সিইও-র বাহিনীর বিন্যাসটা কিরকম?
উত্তর— সিইও-র দফতরে গৃহকর্তা সিইও। এর পর যথাক্রমে অ্যাডিশনাল সিইও, জয়েন্ট/ ডেপুটি সিইও। পিরামিডের পাশে স্তম্ভের মত তথ্য প্রযুক্তি। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের সময় সিইও দফতরে সিইও ছাড়াও ছিল একজন জয়েন্ট সিইও, ৫ জন অ্যাডিশনাল সিইও এবং ৪ জন ডেপুটি সিইও। এই ১১ জন আধিকারিকের মধ্যে ছিলেন পাঁচ আইএএস অফিসার এবং ৬ জন ডব্লুবিসিএস (এক্সিকিউটিভ) অফিসার। তাঁদের অধিকাংশই এখন দায়িত্বে নেই। এখন সিইও ছাড়া আছেন ৫ জন জয়েন্ট সিইও, ৩ জন অ্যাডিশনাল সিইও এবং ৩ জন ডেপুটি সিইও। নানা কাজে সহায়তা করার জন্য আছেন সব মিলিয়ে আরও প্রায় ৩০ জন।
প্রশ্ন— আর, এসআইআর-এর ভাবনা/তদারকির বহর?
উত্তর— রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রথমেই অভিজ্ঞ সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এক আইএএস আধিকারিককে স্পেশাল রোল অবজার্ভারের (এসআরও) দায়িত্ব দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। এর পর এই দায়িত্বে আনা হয়েছে আরও ৪ জনকে। এঁরা এবং প্রতি জেলার রোল অবজার্ভাররা সকলেই আইএএস অফিসার।
প্রশ্ন— রূপায়ণ করছেন কারা?
উত্তর— ডিস্ট্রিক্ট ইলেকশন অফিসার (ডিইও)= ২৪, ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও) = ২৯৪, সহকারী ইআরও = ৩০৫৯,
অতিরিক্ত সহকারী ইআরও =২৭৬৩, সুপারভাইজার = ৮,১৩৬, বিএলও = ৮০,৬৮১,
অতিরিক্ত বিএলও = ১৯,০০০, বিএলএ-২ প্রায় ২১০০০০।

