রাজ্য রাজনীতিতে ফের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। খোদ রাজ্যের এক প্রাক্তন মন্ত্রীর বান্ধবীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠল। আর এই অভিযোগের তির অন্য কারও দিকে নয়, খোদ ওই মহিলার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কনস্টেবলের বিরুদ্ধে। রক্ষকই যখন ভক্ষকের রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে প্রশাসনিক তৎপরতা। স্থানীয় পুলিশের ভূমিকায় সন্তুষ্ট না হয়ে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হন ওই অভিযোগকারিণী। আর তাতেই মেলে হাতেনাতে ফল। গ্রেফতার করা হয়েছে অভিযুক্ত নিরাপত্তারক্ষীকে। এই ঘটনায় গোটা কলকাতা (Kolkata) শহর জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
জানা গিয়েছে, ওই অভিযোগকারিণী প্রথম থেকেই আইনি পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুবিচার চেয়ে তিনি প্রথমে রবীন্দ্র সরোবর (Rabindra Sarobar) থানায় অভিযোগ দায়ের করতে যান। কিন্তু সেখানে তাঁর অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না। অভিযোগকারিণীর দাবি, রবীন্দ্র সরোবর থানার পুলিশের ভূমিকা তাঁর কাছে একেবারেই ‘সন্তোষজনক’ বলে মনে হয়নি। একজন ভিআইপি-র ঘনিষ্ঠ হওয়ার পরেও তাঁকে যদি থানায় গিয়ে এমন উদাসীনতার শিকার হতে হয়, তবে সাধারণ মহিলাদের অবস্থা ঠিক কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে।
থানার ওপর ভরসা হারিয়ে শেষমেশ একপ্রকার বাধ্য হয়েই কড়া পদক্ষেপ নেন প্রাক্তন মন্ত্রীর ওই বান্ধবী। তিনি সরাসরি ‘মুখ্যমন্ত্রী হেল্পলাইন’-এ (Chief Minister Helpline) ফোন করেন। পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) সরকারের এই বিশেষ হেল্পলাইন নম্বরটি সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ সরাসরি প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগকারিণী জানিয়েছেন, হেল্পলাইনে ফোন করার পর অভাবনীয় দ্রুততায় কাজ হয়। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয় এই স্পর্শকাতর বিষয়টিতে।
উপরমহল থেকে নির্দেশ আসতেই নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। যে থানা প্রথমে গড়িমসি করছিল বলে অভিযোগ, তারাই চরম তৎপরতার সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। এরপর কালবিলম্ব না করে অভিযুক্ত ওই কনস্টেবলকে গ্রেফতার করা হয়। নিজের নিরাপত্তারক্ষীর হাতেই শ্লীলতাহানির শিকার হওয়ার এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও, প্রশাসনের এই দ্রুত পদক্ষেপে তিনি অনেকটাই আশ্বস্ত হয়েছেন।
অভিযোগকারিণী সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের বয়ানে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র মুখ্যমন্ত্রীর হেল্পলাইনে অভিযোগ জানানোর কারণেই তিনি এত দ্রুত সুবিচার পেলেন। প্রশাসনিক এই উদ্যোগের ফলে তাঁর মতো আরও অনেকেই যে বিপদের দিনে সরাসরি সাহায্য পাচ্ছেন, সেই কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
নারী নিরাপত্তা নিয়ে গোটা দেশ জুড়েই যখন বারবার প্রশ্ন উঠছে, তখন এই ধরনের ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে যাঁদের ওপর সুরক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে, তাঁরাই যদি এমন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েন, তবে সমাজ এক গভীর সঙ্কটের মুখে দাঁড়ায়। তবে, এই অন্ধকার দিকটির পাশাপাশি আশার আলো দেখিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর চালু করা অভিযোগ গ্রহণ কেন্দ্র। সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি এই ব্যবস্থা যে শুধু খাতায়-কলমেই আটকে নেই, বরং বাস্তবেও তার সুফল মিলছে, এই ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এই ঘটনা একদিকে যেমন পুলিশ প্রশাসনের একাংশের গাফিলতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে রাজ্য সরকারের শীর্ষ স্তরের কড়া নজরদারির বিষয়টিও প্রমাণ করছে। একজন পুলিশ কর্মীর বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠায় পুলিশ মহলেও যথেষ্ট অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। অভিযুক্ত কনস্টেবলের বিরুদ্ধে কড়া বিভাগীয় তদন্তের দাবিও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। সব মিলিয়ে এই শ্লীলতাহানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আপাতত সরগরম রাজ্যের প্রশাসনিক মহল। আগামী দিনেও নিচুতলার প্রশাসন আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে কাজ করবে এবং এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কড়া পদক্ষেপ নেবে, এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সমাজের বিশিষ্টজনেরা।


Recent Comments