২১ জুলাই শহিদ দিবসের সমাবেশকে রাজনৈতিক বার্তার মঞ্চে পরিণত করলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিকে বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ, অন্যদিকে দলীয় বিদ্রোহীদের কড়া বার্তা—সবকিছুর পাশাপাশি বামপন্থী দলগুলির প্রতিও ঐক্যের আহ্বান জানালেন তিনি। তাঁর দাবি, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে রক্ষা করতে হলে মতাদর্শগত বিভেদ ভুলে বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বলেন, দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা আজ গভীর সংকটের মুখে। সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ, বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে সাধারণ মানুষের বঞ্চনা এবং ওবিসি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্রের নীতির ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে এবং সেই কারণেই রাজ্যের মানুষের পাশে দাঁড়াতে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এবার তৃণমূলের আন্দোলন শুধু কলকাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। জেলার পর জেলা ঘুরে মানুষের কাছে পৌঁছবেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। মানুষের সামনে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হবে এবং বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র করা হবে বলে জানান তিনি।
এদিনের সভায় বিরোধী ঐক্যের প্রসঙ্গও বিশেষ গুরুত্ব পায়। মমতা বলেন, তাঁর কারও প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা অহংকার নেই। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে একসঙ্গে আসার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর কথায়, “আজ আমাদের শেষ করার চেষ্টা হচ্ছে। আমাদের শেষ করার পর আপনাদেরও শেষ করে দেওয়া হবে। তাই এখনও সময় আছে, সবাইকে এক হয়ে লড়াই করতে হবে। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হবে।”
এই প্রসঙ্গে তিনি রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর নিজের কালীঘাটের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যেরও উল্লেখ করেন। তখনও তিনি বাম, অতিবাম, জাতীয় রাজনৈতিক দল, ছাত্র-যুব সংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও এনজিওগুলিকে বিজেপির বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক মঞ্চে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এদিন শহিদ দিবসের মঞ্চ থেকেও সেই অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বক্তৃতায় বামপন্থী নাট্যব্যক্তিত্ব চন্দন সেনের কথাও উল্লেখ করেন মমতা। তিনি জানান, অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস নিয়ে চন্দন সেনের একটি বক্তব্য তিনি দেখেছেন, যেখানে সবাইকে একজোট হয়ে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে নামার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে মমতা বলেন, গণতন্ত্রের স্বার্থেই বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন।
একইসঙ্গে দলীয় বিদ্রোহীদেরও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন তৃণমূল নেত্রী। তিনি দাবি করেন, কিছু নেতা ব্যক্তিস্বার্থে দল ছেড়েছেন এবং এখন বিজেপির আশ্রয়ে রয়েছেন। তবে এতে তৃণমূল দুর্বল হয়নি। তাঁর কথায়, “নেতারা যেতে পারেন, কিন্তু কর্মীরা আমাদের ছেড়ে যাননি। আসল তৃণমূল আমাদের সঙ্গেই রয়েছে।” তিনি আরও জানান, প্রয়োজন হলে নতুন কমিটি গঠন করা হবে এবং সংগঠনকে নতুনভাবে শক্তিশালী করা হবে।
বক্তৃতায় উঠে আসে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্নের ইতিহাসও। ১৯৯৭ সালের কংগ্রেসের ‘ইন্ডোর-আউটডোর’ পর্বের কথা স্মরণ করে মমতা বলেন, সেই সময়ও অনেকেই তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের সমর্থনেই পরে তৃণমূল কংগ্রেস আত্মপ্রকাশ করে এবং ধীরে ধীরে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। সেই লড়াইয়ের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতেও কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দেন।
সভার শেষদিকে কর্মীদের উদ্দেশে মমতা বলেন, “আজ থেকেই নতুন পথচলা শুরু হল। যারা এই আন্দোলনের সঙ্গে থাকবে, তারা মানুষের জন্য লড়বে। যারা থাকবে না, তারা ঘরে বসে থাকুক। আমরা মানুষের কাছে যাব, সত্যিটা তুলে ধরব এবং বিজেপির মুখোশ খুলে দেব।”
২১ জুলাইয়ের এই সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে একাধিক রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিজেপির বিরুদ্ধে জেলা জুড়ে আন্দোলনের ঘোষণা, দলীয় সংগঠন পুনর্গঠনের ইঙ্গিত, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান এবং বাম-সহ বিরোধী শক্তিকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান—সব মিলিয়ে আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের রূপরেখা এদিনের মঞ্চ থেকেই তুলে ধরলেন তৃণমূল নেত্রী।


Recent Comments