রেশমী চৌধুরী (Guest writer)

গত ১৬/১০/২৬ আমরা যাত্রা শুরু করলাম কেরলমে দীর্ঘ পরিকল্পিত সফরের উদ্দেশ্যে। প্রথমেই বলে রাখি আমাদের কোচি থেকে তিরুবনন্তপুরম পর্যন্ত পরিকল্পনা করা ছিল। আমরা একটি ভ্রমণসংস্থার সাহায্যে পুরোটা দেখেছি ও গেছি। হোটেলের যাবতীয় ব্যবস্থা তারাই করে দিয়েছে। ফলে আমাদের অনেক সুবিধা হয়েছে।

অন্য শহরের মতো কেরলমে সহজে গাড়ি ভাড়া পাওয়া একটু অসুবিধার। কলকাতা থেকে চেন্নাই হয়ে কোচি পৌঁছালাম, সুসজ্জিত এয়ারপোর্ট। নির্দিষ্ট গাড়ি করে পৌঁছে গেলাম হোটেলে।

পরের দিন কোচি ঘুরে দেখলাম আথিয়াপোল্লি ওয়াটারফলস, বর্ষায় এর রূপ আরও সুন্দর হয়ে ওঠে, ‘বাহুবলী’ সিনেমাটি এই জলপ্রপাতকে আরও চিনিয়ে দিয়েছে পর্যটকদের কাছে। তারপর আরও কয়েকটি জলপ্রপাত পথে দেখা মিললেও অতটা বড় ছিল না। তারপর পাহাড় ও চা বাগান ঘেরা মুন্নারে উপস্থিত হলাম।

চারিদিকে বাহারি ফুলের হাতছানি হঠাৎ যেন মনটাকে ভালো করে দেয়।যারা রোজ মেট্রোর ভিড়, অটো পাওয়ার ঝামেলা মুখোমুখি হন, তাঁরা ভাববেন কয়েক মুহূর্তের জন্য মুন্নার বোধহয় সবচেয়ে ভালো থাকার জায়গা। কিন্তু এই পাহাড় চা বাগান আমাদের উত্তরবঙ্গেও আছে। কিন্তু মুন্নারের মানুষকে অনেক বেশি সচেতন মনে হলো নিজের শহরকে সুন্দর রাখার ক্ষেত্রে।

চা বাগান, স্পাইস গার্ডেন, মুরাপত্তি ড্যাম, এরাভিকুলাম ন্যাশনাল পার্ক প্রত্যেকটাই খুব ভালো। এরাভিকুলামে চোখে পড়ল ১২ বছর অন্তর নীলকুরঞ্জি নামক যে ফুল ফোটে তার কিছু ঝলক (সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর প্রথম সপ্তাহে ফুটে শেষ হয়ে গেছে)।

বাস আপনাকে এই পার্কে একটা জায়গায় ছেড়ে দেবে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে প্রকৃতি উপভোগ করা। এখানে সত্যি নাগরিক কোলাহল পৌঁছাবে না। আপনি যতক্ষণ ইচ্ছা পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করতে পারেন।

বিশ্রামের জন্য বসার জায়গা থাকলেও খাবারের দোকান এরা রাখেনি, অযথা জায়গাটি যাতে নোংরা না হয়। মুন্নার শান্ত, পরিষ্কার।

থেকাড্ডিতে জঙ্গলে বোট করে পেরিয়ার লেকে ১:৩০ মিনিটের সফর। আগে থেকে টিকিট কেটে রাখতে হবে পছন্দের স্লট অনুযায়ী। এটির ব্যবস্থাও বেশ ভালো। বিকালেও এখানে স্থানীয় মার্কেট, চার্চ ইত্যাদি ঘুরে দেখতে পারেন। আল্লেপি ব্যাকওয়াটারে বোট রাইড বিখ্যাত হলেও কোভালামে বোট রাইড যা পুবার আইল্যান্ড নিয়ে যায় ওটা অনেক বেশি সুন্দর।

নাইয়ার নদী সমুদ্রে মিশেছে তা ব্যাকওয়াটারের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়ে দেখায়।ভারকালা সমুদ্র সৈকত সুন্দর তবে বেশ নির্জন। জিনিসপত্রের দামও বেশি। কোভালামে পাহাড় সমুদ্র মিশে একাকার। এই জায়গাটাতে মনটা সত্যি কিছুক্ষণের জন্য কল্পনাবিলাসী হয়ে ওঠে।

তবে সন্ধ্যার ৭টার পর জলে কাউকে নামতে দেওয়া হয় না, এক্ষেত্রে নিয়ম বেশ কঠোর, দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য সত্যি ভালো পদক্ষেপ।
এখানে জটায়ু আর্থ সেন্টার, শিব মন্দির ও পদ্মনাভস্বামী মন্দির ঘুরে দেখতে ২ দিন লাগবে। জটায়ুতেও আগে থেকে টিকিট কেটে রাখতে পারেন। বাকি মন্দিরে পুজো দেওয়ার কোনো রীতি নেই তাই মন্দির চত্বর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

কেরলমে খাবারের অসুবিধা হলেও কয়েকদিনের বেড়ানোর জন্য ওইটুকু উপেক্ষা করা যেতেই পারে। তবে এখানে এলে কিংফিশ অবশ্যই খাবেন। ফেরার সময় কেরলমের স্মৃতি মনে নিয়ে প্রিয়জনদের জন্য চা, চকলেট ও মশলা নিয়ে আসতে ভুলবেন না। তাই একেন অনুরাগী হলেও বলব কেরলমে কুরুক্ষেত্র নয়; পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল, চা বাগান, দিগন্ত বিস্তৃত বালুকারাশি সব মিলিয়ে অপরূপা কেরলম।

শেষে জানাই, ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর রাজ্য পুনর্গঠনের সময় মালায়লাম উচ্চারণের কেরলম হয়ে গিয়েছিল কেরল। বাসিন্দাদের দাবি ছিল স্থানীয় উচ্চারণ মেনে
ফের রাজ্যের নাম কেরলম করার। গত ২৫ আগস্ট থেকে তা কার্যকরী হয়েছে।

Recent Comments