রাজ্যের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ধাক্কা। বাংলার দুই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University) এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় (Presidency University)-তে চলতি শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট (PG) স্তরের কোর্সগুলিতে ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ থাকার এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত উদ্বেগজনক খবর সামনে আসছে। রাজ্যের প্রথম সারির এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে ইতিমধ্যেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে হাজার হাজার কৃতী পড়ুয়ার।
শিক্ষা মহল সূত্রে খবর, প্রতি বছর এই দুই নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমএ (MA), এমএসসি (MSc) বা এমকম (MCom)-এর মতো উচ্চতর পাঠ্যক্রমে ভর্তির জন্য রাজ্যের পাশাপাশি ভিন রাজ্য থেকেও প্রচুর মেধাবী ছাত্রছাত্রী অপেক্ষা করে থাকেন। কিন্তু হঠাৎ কেন এই দুই কেন্দ্রেই পিজির (PG) ভর্তি প্রক্রিয়া থমকে গেল, তা নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে শিক্ষা দপ্তরে।
কেন নেওয়া হলো এমন নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত?
বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা দপ্তর সূত্রে নিখুঁত কোনো কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট না করা হলেও, শিক্ষাবিদদের একাংশের অনুমান— উপাচার্যহীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত আইনি জটের কারণেই এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই রাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী উপাচার্য (Vice Chancellor) নিয়োগ নিয়ে নবান্ন ও রাজভবনের টানাপোড়েন চলছে। সেই প্রশাসনিক শূন্যতার চূড়ান্ত মাশুল এবার গুনতে হচ্ছে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের।
পাশাপাশি, নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি বা এনইপি (NEP)-র কাঠামো অনুযায়ী চার বছরের স্নাতক স্তর চালু হওয়ার পর স্নাতকোত্তরের পাঠ্যক্রম ও ক্রেডিট সিস্টেম (Credit System) বিন্যাসে যে বড়সড় রদবদল এসেছে, তার সাথে এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামোর সমন্বয়হীনতাও এই ভর্তি বন্ধের অন্যতম বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন পড়ুয়ারা, কাঠগড়ায় প্রশাসন
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই যাদবপুর ও প্রেসিডেন্সির ছাত্র সংগঠনগুলি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ছাত্র প্রতিনিধিদের স্পষ্ট দাবি, “প্রশাসনিক অপদার্থতা এবং রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের শিক্ষা বিরোধী নীতির কারণেই আজ রাজ্যের শ্রেষ্ঠ দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ এভাবে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।”
যে সমস্ত পড়ুয়ারা সদ্য স্নাতক স্তরের পরীক্ষা শেষ করে এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ বিশ বাঁও জলে। নিয়মিত ভর্তি প্রক্রিয়া না হলে বহু পড়ুয়ার একটি আস্ত বছর নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ভিন রাজ্যে বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে পা বাড়াতে পারেন, যা রাজ্যের মেধা অনায়াসে বাইরে চলে যাওয়ার (Brain Drain) পথ আরও প্রশস্ত করবে
শিক্ষা মহলের এই চরম সংকটের দিনে উচ্চশিক্ষা দপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শীর্ষ কর্তৃপক্ষ ড্যামেজ কন্ট্রোলে (Damage Control) নেমে কোনো বিকল্প বা আপৎকালীন ব্যবস্থা ঘোষণা করে কি না, এখন সেটাই দেখার। অন্যথায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আগামী দিনে কলকাতার ছাত্র রাজনীতি এবং রাজপথ যে আবারও উত্তাল হয়ে উঠবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।


Recent Comments