শহরের লাইফলাইন থমকে গেল আচমকাই! বৃহস্পতিবার, ৭ মে দুপুরে এক পশলা বৃষ্টি আর দমকা হাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই স্বস্তির মূল্য যে এত চরম ভোগান্তির মাধ্যমে চোকাতেও হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি কলকাতা (Kolkata)-র নিত্যযাত্রীরা। এদিন দুপুরে মেট্রোর ব্লু লাইন (Blue Line)-এর ট্র্যাকে আচমকাই একটি আস্ত গাছ উপড়ে পড়ে। এর জেরে দীর্ঘক্ষণ আংশিক বন্ধ থাকে শহরের অন্যতম প্রধান এই পরিবহণ ব্যবস্থা। খণ্ডিত রুটে মেট্রো চললেও, কাজের দিনে গন্তব্যে পৌঁছতে গিয়ে রীতিমতো কালঘাম ছুটে যায় হাজার হাজার যাত্রীর। ঠিক কী ঘটেছিল এদিন?
বেলা তখন প্রায় আড়াইটে। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ২টো বেজে ৩৭ মিনিট। এমনিতেই দিনের এই সময়টায় মেট্রোয় বেশ ভিড় থাকে। স্কুল-কলেজ ফেরত ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে দুপুরের শিফটের অফিস যাত্রীরা সকলেই নির্ভর করেন এই পরিষেবার ওপর। আচমকাই মহানায়ক উত্তম কুমার (Mahanayak Uttam Kumar) অর্থাৎ টালিগঞ্জ (Tollygunge) এবং নেতাজি (Netaji) অর্থাৎ কুদঘাট (Kudghat)-এর মাঝামাঝি অংশে ডাউন লাইনের ওপর হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে একটি বড় গাছের ডাল। বিগত কয়েক দিন ধরেই শহরে বিক্ষিপ্তভাবে কালবৈশাখীর ঝড়-বৃষ্টি চলছে।
আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনার জেরে মাটির বাঁধন আলগা হয়ে গিয়েছিল আগেই। এদিন দুপুরের হালকা ঝোড়ো হাওয়াতেই সেই নরম মাটি থেকে শিকড় উপড়ে সরাসরি মেট্রোর ট্র্যাকে আছড়ে পড়ে গাছটি।বড়সড় বিপদের হাত থেকে রক্ষাসৌভাগ্যবশত, যে মুহূর্তে গাছটি লাইনের ওপর এসে পড়ে, ঠিক সেই সময় ওই নির্দিষ্ট অংশে কোনও মেট্রোর রেক ছিল না। যদি সেই মুহূর্তে কোনও ট্রেন দ্রুত গতিতে ওই লাইনে চলে আসত, তবে বড়সড় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা এড়ানো যেত না। কিন্তু গাছটি সরাসরি হাই ভোল্টেজ থার্ড রেলের ওপর পড়ায় বিপদ বুঝেই তৎক্ষণাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। থমকে যায় গোটা ব্লু লাইনের ডাউন দিকের পরিষেবা।চরম দুর্ভোগে নিত্যযাত্রীরাহঠাৎ করে মেট্রো থেমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে যারা সেই মুহূর্তে পাতালে অর্থাৎ আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনগুলোতে ছিলেন, তাদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে শোচনীয়। ময়দান (Maidan) স্টেশনে অনেক যাত্রীকে মেট্রো থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। স্টেশন মাস্টারের তরফ থেকে মাইকিং করে ঘোষণা করে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, আপাতত গড়িয়া (Garia) থেকে রবীন্দ্র সদন (Rabindra Sadan) পর্যন্ত মেট্রো চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। শুধুমাত্র দক্ষিণেশ্বর (Dakshineswar) থেকে ময়দান পর্যন্ত একটি খণ্ডিত রুটে মেট্রো চালানো হচ্ছিল সেই সময়।রাস্তায় উপচে পড়া ভিড় ও ট্রাফিক জ্যামহঠাৎ করে মাঝপথে নেমে যেতে বাধ্য হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা দেখা যায়।
এক নিত্যযাত্রী বিরক্তি প্রকাশ করে আমাদের জানান, “জরুরি কাজে দক্ষিণ কলকাতা যাচ্ছিলাম। হঠাৎ ময়দানে নামিয়ে দিল। এখন ওপরে গিয়ে বাস বা ক্যাব পেতে যা অবস্থা হবে, তাতে আর সময়ে পৌঁছনো সম্ভব নয়।” সত্যিই তাই, মেট্রো বিভ্রাটের সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ে শহরের রাস্তার ওপর। টালিগঞ্জ থেকে রবীন্দ্র সদন পর্যন্ত রাস্তায় বাস এবং অটোর জন্য লম্বা লাইন চোখে পড়ে। একেই তো ভ্যাপসা গরম, তার ওপর গন্তব্যে পৌঁছনোর তাগিদে যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। ট্যাক্সি চালকরাও এই সুযোগে অনেক জায়গায় অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজখবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে ছুটে যান মেট্রো রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ইঞ্জিনিয়ার এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সদস্যরা। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকা অবস্থাতেই অত্যন্ত সাবধানে গাছ কাটার কাজ শুরু হয়। যেহেতু জায়গাটি মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে এবং সেখানে পৌঁছনোর রাস্তা খুব একটা সহজ নয়, তাই গাছ কেটে সরাতে বেশ বেগ পেতে হয় কর্মীদের। তবে যাত্রীদের কথা মাথায় রেখে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চালিয়ে যান তারা।
আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দ্রুত গাছের ডালপালা সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়।অবশেষে স্বস্তিপ্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে এই গাছ সরানোর কাজ। এরপর লাইন পরীক্ষা করে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করে বিকেল সোয়া ৪টে নাগাদ ফের সম্পূর্ণ রুটে মেট্রো চলাচল শুরু হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার খবর পেয়ে যাত্রীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তবে ততক্ষণে যা ভোগান্তি হওয়ার, তা হয়ে গিয়েছে।


Recent Comments