ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে আজ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকল। রাজধানী দিল্লি (Delhi)-র সংসদ ভবনে শুরু হয়েছে বাজেট অধিবেশনের বিশেষ পর্ব। এপ্রিলের তপ্ত রোদে যেমন বাইরের আবহাওয়া গরম, তেমনই সংসদের অন্দরে আজ রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল চরমে। মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বহুল চর্চিত ‘নারী সংরক্ষণ বিল’ (Women’s Reservation Bill) এবং এর সাথে জড়িয়ে থাকা আগামী দিনের নির্বাচনী মানচিত্র পরিবর্তনের পরিকল্পনা।
আজ লোকসভা (Lok Sabha)-য় কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল (Arjun Ram Meghwal) উত্থাপন করেন ‘সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল, ২০২৬’। সরকারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট— ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত করা। তবে এই সংরক্ষণের পথ প্রশস্ত করতে সরকার যে ‘ডিলিমিটেশন’ বা সীমানা নির্ধারণ বিলের প্রস্তাব এনেছে, তা নিয়েই বেঁধেছে প্রবল বাকযুদ্ধ।
প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, লোকসভার বর্তমান আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৫ বা তারও বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার পক্ষের দাবি, জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা এবং মহিলাদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতেই এই আসন বৃদ্ধি প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় বিরোধী দলগুলোর কাছে আর্জি জানান, বিষয়টিকে যেন রাজনীতির চশমায় না দেখা হয়। তিনি বলেন, “এটি দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার অধিকারের প্রশ্ন। যারা এই বিলের বিরোধিতা করবে, দেশের নারী সমাজ তাদের ক্ষমা করবে না।” মোদী আরও আশ্বাস দেন যে, আসন বিন্যাসের ফলে কোনো রাজ্যের বর্তমান প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
বেণুগোপাল (K C Venugopal) সংসদে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলেন, কেন ২০২৩ সালে বিলটি পাস হওয়ার পরেও তা কার্যকর করতে এত দেরি করা হল? বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার আসলে নারী সংরক্ষণের আড়ালে সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো আশঙ্কা করছে যে, জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বিন্যাস হলে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোর তুলনায় তাদের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। বিরোধীদের এই আপত্তির মধ্যেই ভোটাভুটি হয়, যেখানে ২৫১ জন সদস্য বিলটি পেশ করার পক্ষে এবং ১৮৫ জন বিপক্ষে মত দেন।
এই বিশেষ অধিবেশনে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল আনা হয়েছে যা দিল্লি, পুদুচেরি এবং জম্মু ও কাশ্মীর (Jammu and Kashmir)-এর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতেও নারী সংরক্ষণ কার্যকর করার পথ তৈরি করবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) এই বিলগুলো নিয়ে আলোচনার সময় স্পষ্ট করে দেন যে, সীমানা নির্ধারণ নিয়ে অযথা আতঙ্ক ছড়ানোর প্রয়োজন নেই।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। একদিকে যেমন সংসদে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে লোকসভার আসন সংখ্যা এক লাফে অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় সংসদীয় কাঠামোর আমূল সংস্কার প্রয়োজন হবে।


Recent Comments