নিজস্ব সংবাদদাতা: মহিলা সংরক্ষণের আড়ালে লোকসভার আসন সংখ্যা একলাফে ৮৫০-তে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আনা কেন্দ্রের ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়ল। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের সামনে লোকসভায় বড়সড় ধাক্কা খেল নরেন্দ্র মোদী-র সরকার। প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না মেলায় পাশ হল না প্রস্তাবিত ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’-এর নতুন সংস্করণ।
শুক্রবারের উত্তপ্ত অধিবেশনে বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ২৯৮টি, বিপক্ষে ২৩০টি। মোট ৫২৮ জন সাংসদ ভোটাভুটিতে অংশ নেন। সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করতে ব্যর্থ হয় শাসক শিবির। ভোটের আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিরোধীদের ‘মহিলা বিরোধী’ বলে কটাক্ষ করেন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে আসন বৃদ্ধির পক্ষে সওয়াল করেন। তবে তাঁর আবেদনেও বিরোধীদের অবস্থান বদলায়নি। উল্টে তিনি রাহুল গান্ধী-কে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে নতুন বিতর্কের সূচনা করেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, মহিলা সংরক্ষণকে সামনে রেখে আসলে আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে উত্তর ভারতের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছিল কেন্দ্র। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও অখিলেশ যাদব-এর মতো নেতাদের দাবি, জনগণনার আগেই আসন সংখ্যা বাড়িয়ে দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমানোর পরিকল্পনা ছিল সরকারের। সংসদে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে রাহুল গান্ধী হুঁশিয়ারি দেন, বিরোধীরা একজোট হয়ে এই চেষ্টা ব্যর্থ করবে। পাশাপাশি তিনি ওবিসি ও দলিত মহিলাদের জন্য আলাদা সংরক্ষণের দাবিও তোলেন।
এই সংসদীয় লড়াইয়ের রেশ এসে পড়েছে বাংলার রাজনীতিতেও। সম্প্রতি তৃণমূলকে আক্রমণ করেছিলেন রাহুল গান্ধী, যার জেরে বিরোধী বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন ডেরেক ও’ব্রায়েন। তবে বিল ভেস্তে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলায়। সূত্রের খবর, শুক্রবার রাতে রাহুল গান্ধী ফোনে কথা বলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সঙ্গে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্য অটুট রাখতেই এই যোগাযোগ।
কেন্দ্রের পরিকল্পনা ছিল সংবিধানের ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করে জনগণনার অপেক্ষা না করেই লোকসভার আসন ৫৪২ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করা। কিন্তু বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের সামনে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ১০৪তম সংশোধনের মাধ্যমে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কোটা তুলে দেওয়া হয়েছিল। এবার আসন বৃদ্ধির উদ্যোগও বড় ধাক্কা খেল।
ভোটাভুটির আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সমাজমাধ্যমে আবেদন জানিয়ে নারী সংরক্ষণকে ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই আবেদনও ফলপ্রসূ হয়নি। প্রথম বিল পাশ না হওয়ায় আসন পুনর্বিন্যাস ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সংশোধনী বিল নিয়ে আর এগোয়নি সরকার।
উল্টোদিকে, সংসদে বিতর্ক যখন চরমে, তখনই কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রক ২০২৩ সালের ১০৬তম সংবিধান সংশোধনী আইন কার্যকর করে। ওই আইনে জনগণনার পরেই আসন পুনর্বিন্যাস ও মহিলা সংরক্ষণের কথা বলা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিলের ব্যর্থতার সম্ভাবনা আগেই আঁচ করে কেন্দ্র এই পদক্ষেপ নেয়, যাতে ‘মহিলা-পক্ষপাতী’ ভাবমূর্তি বজায় থাকে।
সব মিলিয়ে, লোকসভায় এই পরাজয় শুধু সংখ্যার অঙ্কে নয়, রাজনৈতিক বার্তাতেও তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে রাহুল গান্ধী ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নতুন সমীকরণ জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ নজর কাড়ছে। এই ফলাফল স্পষ্ট করে দিল—বিরোধীরা একজোট থাকলে সংবিধান সংশোধনের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া কেন্দ্রের পক্ষে সহজ নয়।

Recent Comments