উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম সুন্দর রাজ্য মণিপুরে (Manipur) শান্তির খোঁজ যেন এক দীর্ঘস্থায়ী মরীচিকায় পরিণত হয়েছে। গত বেশ কয়েক মাস ধরে চলা জাতিগত দাঙ্গা এবং চরম রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর রাজ্যবাসী বুক বেঁধেছিলেন, নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে হয়তো অবশেষে রক্তপাতের অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের ঠিক পরপরই নতুন করে হিংসার আগুনে জ্বলতে শুরু করেছে রাজ্যটি। রাজনৈতিক মঞ্চে যখন নেতারা শপথবাক্য পাঠ করছেন এবং হাসিমুখে করমর্দন করছেন, ঠিক সেই সময়ই রাজপথে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং হতাশা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে। এই ঘটনা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, কেবল ক্ষমতার হাতবদলেই রাজ্যের গভীরে প্রোথিত সমস্যাগুলির রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়।
রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যে এবং প্রশাসনিক কাজে দ্রুত গতি আনতে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন ইয়ুমনাম খেমচাঁদ সিং (Yumnam Khemchand Singh)। নতুন সরকারে সব পক্ষের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত সুকৌশলে দুটি উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ তৈরি করা হয়েছে। কুকি (Kuki) সম্প্রদায়ের মানুষদের হারানো আস্থা অর্জনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে ওই সম্প্রদায়ের হেভিওয়েট নেত্রী এবং বিধায়ক নেমচা কিপগেনকে (Nemcha Kipgen) রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, রাজ্যের রাজনীতিতে আরও একজন দাপুটে নেতা এবং বিধায়ক লোসি দিখোকে (Losii Dikho) দ্বিতীয় উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা ছিল, এই ধরনের একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং মিশ্র মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকা এবং সমতলের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও দূরত্বের প্রাচীর তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। কিন্তু শপথ গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
নতুন এই রাজনৈতিক সমীকরণ এবং মন্ত্রিত্বের বন্টন মেনে নিতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে রাজ্যের একটি বিশাল অংশ। বিশেষ করে, কুকি সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সরাসরি এই দুই নবনিযুক্ত উপমুখ্যমন্ত্রীকে সম্পূর্ণভাবে বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট—দীর্ঘদিন ধরে তারা যে বঞ্চনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অস্তিত্বের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, নিছক কয়েকটি মন্ত্রিত্বের টোপ দিয়ে সেই ক্ষোভ প্রশমিত করা যাবে না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিজেদের সম্প্রদায়ের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও নেমচা কিপগেনের বিরুদ্ধে এই বয়কটের ডাক প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মাত্রা রাজনৈতিক হিসেবনিকেশের অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছে। এই বয়কটের ডাক মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ও মুখে মুখে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন করে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
প্রতিবাদের এই আঁচ সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে চূড়াচাঁদপুর (Churachandpur) এলাকায়।
অতীতেও এই সংবেদনশীল জেলাটি বারবার হিংসা এবং রক্তপাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। নতুন সরকারের শপথের খবরের পরপরই সেখানে হাজার হাজার উন্মত্ত জনতা রাস্তায় নেমে আসে। শুরু হয় ব্যাপক তাণ্ডব এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তিতে ভাঙচুর। মুহূর্তের মধ্যে বেশ কয়েকটি জায়গায় ভয়াবহ অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের লেলিহান শিখা এবং কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা এলাকার আকাশ। পরিস্থিতি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে প্রশাসন তড়িঘড়ি বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং নিরাপত্তা রক্ষী মোতায়েন করে। কিন্তু উত্তেজিত জনতা পিছু হটার বদলে পুলিশকে লক্ষ্য করে তুমুল পাথর বৃষ্টি শুরু করে। চারপাশ থেকে উড়ে আসা ইট-পাটকেলের আঘাতে বেশ কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী আহত হন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নিজেদের আত্মরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়েই কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে পুলিশ প্রশাসন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে প্রথমে লাঠিচার্জ এবং পরে দফায় দফায় কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। পুলিশের সঙ্গে উত্তেজিত জনতার এই সরাসরি খণ্ডযুদ্ধের জেরে গোটা চূড়াচাঁদপুর এলাকা কার্যত একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে নিজেদের ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েছেন। রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। যান চলাচল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকানপাট—সবই বন্ধ।


Recent Comments