আজ মতুয়া সমাজের কাছে এক অত্যন্ত আবেগের দিন। আজ মতুয়া মহাসঙ্ঘের প্রাণপুরুষ স্বরূপিনী বড়মা বীণাপাণি দেবীর প্রয়াণ দিবস। এই বিশেষ দিনটিতে একদিকে যেমন বড়মাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করলেন রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তেমনই অন্যদিকে নাগরিকত্ব বা CAA (Citizenship Amendment Act) ইস্যুতে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানালেন কেন্দ্রের শাসক দল BJP (Bharatiya Janata Party)-কে।
সাম্প্রতিক কালে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission) যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে বিস্তর জলঘোলা হচ্ছে। জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত প্রায় ৬৩ লক্ষ ভোটারের নাম এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার ফলে সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অভিযোগ উঠছে যে, রাজ্যের বেশ কয়েকটি জেলা, যেমন উত্তর ২৪ পরগনা (North 24 Parganas) এবং নদিয়া (Nadia)-সহ অন্যান্য বেশ কিছু অঞ্চলে বসবাসকারী মতুয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষের নাম এই ভোটার তালিকা থেকে সরাসরি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আরও অনেক নামকে রাখা হয়েছে ‘Under Review’ বা বিচারাধীন অবস্থায়। এই পরিস্থিতির কারণে গোটা মতুয়া সমাজ বর্তমানে এক চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বহু মানুষ দেশছাড়া হওয়ার অজানা আশঙ্কায় ভুগছেন। ভারত (India) নামক এই বিশাল গণতান্ত্রিক দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা আজ সন্দিহান।
ঠিক এইরকম এক সংকটজনক পরিস্থিতিতে মতুয়া ভাই-বোনদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি কেন্দ্রের BJP সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। নিজের Social Media Account-এ তিনি স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকারের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং চক্রান্তের ফলেই আজ মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষজন এক অত্যন্ত অস্থির ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে শুধুমাত্র রাজনীতির খেলা চলছে।” তবে তিনি রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে সমস্ত মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, বাংলা (Bengal)-র মাটিতে বসবাসকারী কোনো মানুষের গায়ে তিনি বিন্দুমাত্র আঁচ লাগতে দেবেন না।
আজকের এই পবিত্র দিনে বড়মা বীণাপাণি দেবীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর Social Media Post-এ লেখেন যে, শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর এবং শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের দেখানো আদর্শ ও পথে চলে মতুয়া মহাসঙ্ঘ বাংলা (Bengal)-র সামাজিক সংস্কার ও নবজাগরণের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। দলিত, শোষিত ও অবহেলিত মানুষের অধিকার রক্ষা করা, সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং জাতপাতহীন এক সুন্দর মানবিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বড়মা সারাজীবন কাজ করে গেছেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বেই মতুয়া মহাসঙ্ঘ আজ সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক মজবুত স্তম্ভ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও স্মরণ করেন বড়মার সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের নিবিড় ও আত্মিক সম্পর্কের কথা। তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে জানান যে, বড়মার স্নেহ তিনি নিজের মায়ের মতোই পেয়েছেন, যা তাঁর জীবনের এক পরম প্রাপ্তি। বড়মার চিকিৎসা থেকে শুরু করে যেকোনো দরকারে ডাক পাওয়া মাত্রই তিনি ছুটে গেছেন। বড়মার অসামান্য সামাজিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ রাজ্য সরকার তাঁকে ‘Banga Bibhushan’ সম্মানে ভূষিত করেছিল, যা অত্যন্ত গর্বের বিষয়।
এর পাশাপাশি, বর্তমান রাজ্য সরকার মতুয়া সমাজের সার্বিক কল্যাণের জন্য কী কী উন্নয়নমূলক কাজ করেছে, তারও একটি বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, মতুয়া বিকাশ পর্ষদ এবং নমঃশূদ্র বিকাশ পর্ষদ গঠন করা হয়েছে মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে। শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মদিনে রাজ্যে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার প্রসারের জন্য ঠাকুরনগর (Thakurnagar)-এ হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে এবং কৃষ্ণনগর (Krishnanagar)-এ এর একটি Extension Campus গড়ে তোলা হচ্ছে। এছাড়াও গাইঘাটা (Gaighata)-তে গড়ে উঠেছে পি আর ঠাকুর সরকারি College। এর পাশাপাশি ‘জলতৃপ্তি’ Water Project, কুঠিপাড়া নাগবাড়ী Bridge, ITI এবং Polytechnic College-সহ একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আজকের দিনে মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তা মতুয়া সমাজের কাছে এক বিশাল বড় ভরসার জায়গা তৈরি করেছে।
