ভারতের (India) নিজস্ব বিদেশ নীতি কি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (United States) ইশারায় এবং ওয়াশিংটনের (Washington) অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত হচ্ছে? রাশিয়ার (Russia) কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়ে আমেরিকার সাময়িক ছাড়পত্র মেলার পরই এই প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Prime Minister Narendra Modi)-র নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানালেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। এই গোটা ঘটনাকে তিনি এক ‘আপসকারী’ বা ‘কম্প্রোমাইজড’ ব্যক্তির শোষণের ফল বলে সোচ্চার হয়েছেন।
প্রেক্ষাপট: রুশ তেল কেনায় মার্কিন ছাড়
মধ্যপ্রাচ্যের (Middle East) বর্তমান ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বড়সড় সঙ্কটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইরান (Iran) এবং ইজরায়েলের (Israel) মধ্যে সামরিক সংঘাতের জেরে অপরিশোধিত তেলের জোগানে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের বাজার যাতে সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল না হয়ে পড়ে, তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়াদিল্লিকে আগামী ৩০ দিনের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ছাড় বা ‘ওয়েভার’ প্রদান করেছে। আর আমেরিকার এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শুরু হয়েছে চরম তরজা।
রাহুলের নিশানায় খোদ প্রধানমন্ত্রী
শুক্রবার মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্সে (X) একটি পোস্ট করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদীকে নিশানা করেন কংগ্রেস (Congress) সাংসদ রাহুল গান্ধী। লোকসভায় তাঁর দেওয়া একটি ভাষণের পুরনো ভিডিও শেয়ার করে তিনি লেখেন, “ভারতের বিদেশ নীতি আমাদের দেশের মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছার ফসল হওয়া উচিত। এর শিকড় থাকা উচিত আমাদের ইতিহাস, ভূগোল এবং সত্য ও অহিংসার আদর্শের গভীরে। কিন্তু আজ আমরা যা দেখছি, তা কোনও স্বাধীন নীতি নয়। এটি আসলে একজন আপসকারী বা কম্প্রোমাইজড ব্যক্তির শোষণের ফল।”
ভিডিওটিতে রাহুলকে চাঁচাছোলা ভাষায় বলতে শোনা যায়, “আমরা কার কাছ থেকে তেল কিনব, আর কার কাছ থেকে কিনব না—তা এখন আমেরিকা ঠিক করে দিচ্ছে। রাশিয়া নাকি ইরান, সেটা আমেরিকা ঠিক করবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্টতই বোঝাতে চেয়েছেন যে, কেন্দ্রের বর্তমান সরকার দেশের বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার কাছে মাথা নত করে ফেলেছে।
কংগ্রেসের সুর চড়ালেন জয়রাম রমেশও
রাহুলের পাশাপাশি এই ইস্যুতে সরব হয়েছেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ (Jairam Ramesh)। তিনি এই গোটা ঘটনাটিকে আমেরিকার ‘ব্ল্যাকমেইল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এক্সে তিনি লেখেন, “ট্রাম্পের (Trump) নতুন খেলা, দিল্লির বন্ধুকে বললেন, পুতিনের (Putin) কাছ থেকে তেল নিতে পারো, আর কতদিন চলবে এই মার্কিনি ব্ল্যাকমেইল?”
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ভারতের তেল আমদানি
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনেই এবং একাধিক শীর্ষ আধিকারিকের মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। ভারত তার মোট আমদানি করা তেলের প্রায় ৪০ শতাংশ এই অঞ্চল থেকে নিয়ে আসে, যার একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) হয়ে আসে। ইরানের সাম্প্রতিক কার্যকলাপের জেরে সেই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
কী বলছে মার্কিন প্রশাসন?
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট (Scott Bessent) জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের জোগান স্বাভাবিক রাখতে এবং ইরানের চাপের কাছে মাথা না নোয়াতেই ভারতকে এই সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে এর পাশাপাশি তিনি এও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন আশা করে আগামী দিনে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি পরিমাণে জ্বালানি আমদানি করবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শর্তসাপেক্ষ ছাড় আসলে আমেরিকার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। একদিকে তারা ভারতের জ্বালানি সঙ্কটে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের পথও নিজেদের জন্য প্রশস্ত করে রাখছে।
