অশোক সেনগুপ্ত
‘হাত ভেঙে দেব’। ‘মাথা ফাটিয়ে দেব’! ‘কে তোকে বাঁচায় দেখব’! এ ধরণের পংক্তিগুলো ভোটবাজারে বঙ্গজীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে বহুদিন আগেই! এক ধরণের রঙ্গও বটে! কেউ এধরণের উক্তি করলে দলের নেতারা মুখ টিপে থাকেন। কারণ, তাঁরা সমাজসংস্কার করতে আসেননি। বরং বাহুবলীরা যাতে দুধেভাতে থাকে, সেদিকে নজর দেওয়াই শ্রেয়।
সিপিএমের অনিল বসু থেকে তৃণমূলের অসিত মজুমদার, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়— রাজনীতিকদের অনেকেই সুভাষণের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। তালিকা অতি দীর্ঘ। বর্ধমান-দুর্গাপুরের তৃণমূলের সাংসদ কীর্তি আজাদ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, রেলের
বর্ধমানের অসম্পূর্ণ পথসেতু ভেঙে ফেলবেন।
এ ব্যাপারে লেখক-বিশ্লেষক, প্রাক্তন সিভিল সার্ভেন্ট গৌতম ভট্টাচার্য বলেন, রাজনীতিতে ‘বাহুবলীদের সুবচন’ নতুন কিছ নয়। সেই সত্তরের দশকেও নকশালরা ‘জোতদারের মুণ্ডু দিয়ে গেন্ডুয়া খেলা’র হুমকি শহরের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ব্যক্তি আক্রমণও যে ছিল না তা নয়। কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষকে তাঁর বিরোধীরা সর্বদাই ‘কানা অতুল্য’ বলে উল্লেখ করতেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ডাইনীরূপে ছবি একে কলকাতার রাস্তাঘাট একসময় বামেরা ভরিয়ে দিয়েছিলো।
কংগ্রেস ও পিছিয়ে ছিল না, একাত্তরে তাঁরাও স্লোগান তুলেছিল “দুই বাংলার দুই পশু – ইয়াহিয়া আর জ্যোতি বসু”। ১৯৮৯এ লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কংগ্রেস বিরোধীদের স্লোগানটাও ভুলবার নয় “অলি-গলি মেঁ শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়”!
কীর্তি আজাদের গোঁসার কারণ কী? ব্রিটিশ আমলে তৈরি সেতুটি জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় সেটি ভেঙে প্রায় চার বছর আগে নতুন সেতু তৈরির কাজ শুরু হয়। সেটি মাঝপথে বন্ধ হয়ে আছে। গত ১০ ডিসেম্বর সংসদে প্রসঙ্গটি তিনি উত্থাপন করেছিলেন। তাতেও লাভ হয়নি। স্টেশন-চত্বর উন্নয়নের নামে চার নম্বর জলাশয় বোঁজানোরও সমালোচনা করেন তৃণমূল সাংসদ।
কীর্তিবাবুর ক্ষোভের একটা যুক্তি আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে রেল-কর্তৃপক্ষের বক্তব্যটা কী? এ সম্পর্কে রেলের দেওয়া চিঠির পুক্তি পছন্দ হয়নি তৃণমূল সাংসদের। আইনের দরজা খোলা আছে! নেত্রী তো বিপুল পরিমাণ অর্থ বছর বছর ধরে খরচ করছেন মামলা মোকদ্দমায়! আদালতের শরনাপন্ন হয়ে রেলকে কান ধরে শিক্ষা দেওয়ার সুযোগটা তিনি হারাচ্ছেন কেন?
এ ব্যপারে গৌতমবাবুর ব্যাখ্যা, “তর্কের খাতিরে বলা যেতেই পারে, অতীতে এইসব সুবচনী স্লোগান দলের পক্ষ থেকে তোলা হতো, কোনো নেতা তাঁর ভাষণে বলতেন না। কিন্তু খুব কি পার্থক্য আছে এর মধ্যে? – আসলে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ঘৃণার রাজনীতিকে কতটা প্রশ্রয় দেবো? রাজনৈতিক দলগুলো যদি এর রাশ না টানে তাহলে কি করে আশা করবো নেতারা বাহুবলীর মতো আচরণ থেকে নিজেদেরকে নিবৃত রাখবে? – এইসমস্ত তথাকথিত নেতারা হাতে মাইক পেলে ‘মাইকাসুর’এর মতো কখনো তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর উদ্দেশ্যে, কখনো বা কোনো অপছন্দের গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি বা আকারে ইঙ্গিতে ঘৃণাভাষণ করবে, এতে আর বিস্ময়ের কি আছে?”
কীর্তিবাবু, কেন্দ্রে যদি আপনার দল শরিক হত, এরকম বাহুবলী-মার্কা বাক্যচয়ণ করতেন? ভোটের আগে রক্ত গরম করা হুঁশিয়ারি দিলে ভক্ত-সমর্থকদের কাছে হিরো হওয়া যায়। কিন্তু সরকারি অর্থে তৈরি অসম্পূর্ণ প্রকল্প ভেঙে ফেলার হুঁশিয়ারি দিতে পারেন? এখানে প্রশ্নটা বিজেপি-তৃণমূলের নয়, প্রশ্নটা ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন রাখতে বিভিন্ন দল এবং জনপ্রতিনিধিদের কতটা সতর্ক থাকা উচিত, তা নিয়ে।
অবশ্য তাঁর আর দোষ কী? দলনেত্রীই তো প্লাবনের সব দায় ডিভিসি-র ওপর চাপিয়ে বাঁধ ভেঙে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন! এই বঙ্গের সব দৈনিকে বড় করে খবরও হয়েছিল সেটি!
কীর্তি আজাদ গত লোকসভা ভোটের আগে ভোটদাতাদের মনে আস্থা আনতে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তিনি এখানেই থাকবেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তাঁকে এলাকায় দেখা যায় না। সেটা তাঁর দল আর এলাকার ভোটদাতাদের ভাবার বিষয়! কিন্তু ‘ভেঙে দেব’, ’গুঁড়িয়ে দেব’— এই বাতাবরণই কি হয়ে উঠবে বাংলার সুবচনের অঙ্গ?
এ ব্যাপারে গ্রামোন্নয়নের বিশেষজ্ঞ, ‘নাবার্ড’-এর প্রাক্তন আধিকারিক বিদ্যুৎ বসু এই প্রতিবেদককে বলেন, “কটূভাষন এবং মাস্তান ভাষন প্রধানত ১। স্বভাব জনিত ২। উত্তেজনা প্রসুত এবং ৩। নেতা/নেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করার জন্য। এই তিন নম্বরটাই ভোটের বাজারে বেশী চলে। আর নেতা/নেত্রী এই ধরনের ভাষনে অভ্যস্ত হলে তো অধস্তনেরা অনুপ্রেরণা পাবেই। তাইই ঘটছে।”


Recent Comments