২০২৯ সালের লোকসভা (Lok Sabha) নির্বাচনের আগেই দেশে নারী সংরক্ষণ আইন বা নারী সংরক্ষণ বিল (Women’s Reservation Act) কার্যকর করতে উদ্যোগী হল কেন্দ্রীয় সরকার। দীর্ঘদিনের এই প্রতীক্ষিত আইনটিকে দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার একটি সংশোধনী বিল আনার জোরদার পরিকল্পনা করছে, যেখানে ২০১১ সালের জনগণনার (Census) তথ্যের ভিত্তিতেই আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন করা হবে। এই পদক্ষেপ সফল হলে দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় মহিলাদের অংশগ্রহণ এক ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছাবে।
প্রস্তাবিত এই সংশোধনীর ফলে সংসদে (Parliament) বড়সড় রদবদল আসতে চলেছে। বর্তমানে নিম্নকক্ষের মোট আসন সংখ্যা ৫৪৩। জানা গিয়েছে, এই নতুন সংশোধনী পাশ হলে আসন সংখ্যা এক ধাক্কায় অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়ে ৮১৬-তে গিয়ে দাঁড়াবে। আর এই বর্ধিত আসনের মধ্যে ২৭৩টি আসন মহিলাদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে সংরক্ষিত থাকবে। চলতি বাজেট অধিবেশনেই অথবা এর জন্য অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে ডাকা কোনও বিশেষ অধিবেশনে এই সংশোধনী বিলটি পেশ করা হতে পারে বলে নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে।
আসন পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে একটি বড় চিন্তার বিষয় ছিল বিভিন্ন রাজ্যের প্রতিনিধিত্বের আনুপাতিক ভারসাম্য। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি বেশ কিছুদিন ধরেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, তার ফলে আসন সংখ্যা বাড়লে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে কমে যেতে পারে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী বেশি জনসংখ্যার রাজ্যগুলি বেশি আসন পেয়ে থাকে। তবে সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, সরকারের নতুন প্রস্তাবে এই দিকটিতে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো অবিচার না হয়। প্রতিটি রাজ্যে আসন সংখ্যা গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে ঠিকই, তবে বর্তমানে রাজ্যগুলির মধ্যে যে আনুপাতিক হার রয়েছে, তা অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। এর ফলে দক্ষিণের রাজ্যগুলিকেও তাদের প্রতিনিধিত্ব হারানোর কোনো ভয় করতে হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভারসাম্যও বজায় থাকবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বিলটি আইনে পরিণত করার জন্য সংসদের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন। তাই সরকার ইতিমধ্যেই বিরোধী দলগুলোর সাথে নিবিড় আলোচনা শুরু করে দিয়েছে যাতে বিলটি পাশ করানোর সময় কোনো বাধার সম্মুখীন হতে না হয়। গত সোমবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) একাধিক বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন।
এই মেগা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (Nationalist Congress Party)-র নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে (Supriya Sule), ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টি (YSR Congress Party)-র পি.ভি. মিথুন রেড্ডি (P.V. Midhun Reddy), অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (All India Majlis-e-Ittehadul Muslimeen)-এর প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি (Asaduddin Owaisi) এবং শিবসেনা (Shiv Sena)-র অরবিন্দ সাওয়ান্ত (Arvind Sawant)-এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।
তবে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা বাড়িয়ে এই তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক এড়িয়ে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) এবং বামফ্রন্ট (Left)। অন্যদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় এনডিএ (NDA) শরিকদের সাথেও আলাদা করে বৈঠক করেছে সরকারপক্ষ। এর আগে কংগ্রেস (Congress) এবং সমাজবাদী পার্টি (Samajwadi Party)-র সাথেও এই বিষয়ে প্রাথমিক স্তরে পরামর্শ করা হয়েছে। বিরোধী শিবিরের পরবর্তী সর্বসম্মত পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে কংগ্রেস মঙ্গলবার সকালে অন্যান্য বিরোধী দলের নেতাদের সাথে একটি রণকৌশলগত বৈঠকে বসবে।
কেন্দ্রীয় সরকার চাইছে সব রাজনৈতিক দলের সমর্থন আদায় করে যত দ্রুত সম্ভব এই বিলটি পাশ করিয়ে নিতে। কারণ সামনেই তামিলনাড়ু (Tamil Nadu), আসাম (Assam), কেরালা (Kerala), পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) এবং পুদুচেরি (Puducherry)-র মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বিধানসভা নির্বাচন কড়া নাড়ছে। এই নির্বাচনের প্রচারে অনেক সাংসদ এবং নেতাই নিজ নিজ রাজ্যে চূড়ান্ত ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, তাই চলতি অধিবেশনে বা একটি বিশেষ অধিবেশন ডেকেই এই ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
সংবিধানের ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের পরের প্রথম জনগণনার ভিত্তিতেই পরবর্তী আসন পুনর্বিন্যাস হওয়ার কথা ছিল। গত ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পাশ হওয়া নারী সংরক্ষণ আইনেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, দশকের জনগণনা সম্পন্ন হওয়ার পরেই আসন সংরক্ষিত হবে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী কোভিড মহামারীর কারণে ২০২১ সালের জনগণনা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়, যা আগামী মাসে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের কারণে নারী সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন ২০৩০ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ার একটা প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তাই সরকার এখন আর দেরি না করে ২০১১ সালের পুরনো তথ্য ব্যবহার করেই এই সংশোধনী আনার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটিকে দ্রুততর করার চেষ্টা করছে। মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের এই পদক্ষেপ যদি ২০২৯ সালের আগেই বাস্তবায়িত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে ভারতের রাজনীতি ও নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।


Recent Comments