চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের আবহের মধ্যে ভারতের নাগরিকদের সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকার বিশেষ বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬ তারিখে তাঁর জনপ্রিয় মাসিক রেডিও সম্প্রচার ‘মন কি বাত’ (Mann Ki Baat) অনুষ্ঠানে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করেন। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিম এশিয়া (West Asia) বা মধ্যপ্রাচ্যে যে ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রীর এই সতর্কবাণী।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দেশের ১৪০ কোটি দেশবাসীকে যেকোনো ধরনের গুজব থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, আমাদের আশেপাশে যে তীব্র সংঘাত চলছে, তা ভারতের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই কঠিন সময়ে গুজব এড়িয়ে, সঠিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে সবাইকে একসাথে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন চরম আকার ধারণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States) এবং ইসরায়েল (Israel) যৌথভাবে ইরান (Iran) আক্রমণ করার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। এর প্রতিশোধ নিতে ইরানও ওয়াশিংটন (Washington)-এর মিত্র দেশগুলোতে এবং তেল আবিব (Tel Aviv) শহরে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এই মুহূর্তে বিশ্বের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হলো হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz), যা ইরান নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান খুব কম সংখ্যক জাহাজকেই এই প্রণালী অতিক্রম করার অনুমতি দিচ্ছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশ (Gulf countries)-গুলোতে বসবাসরত ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়েও প্রধানমন্ত্রী মোদী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ওই অঞ্চলে প্রায় ১ কোটির বেশি ভারতীয় নাগরিক কর্মরত আছেন, যাদের কষ্টার্জিত আয় দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখে। তবে আশার কথা হলো, সৌদি আরব (Saudi Arabia), সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), কাতার (Qatar), বাহরাইন (Bahrain), কুয়েত (Kuwait) এবং জর্ডান (Jordan)-এর মতো দেশগুলো ভারতীয়দের সব ধরনের সহায়তা প্রদান করছে। এই সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদী ওই দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি তাঁর গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
কূটনৈতিক স্তরে ভারত যে নিষ্ক্রিয় বসে নেই, সে কথাও প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি ফ্রান্স (France), মালয়েশিয়া (Malaysia) এবং অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর সাথেও তাঁর দীর্ঘ টেলিফোনিক কথোপকথন হয়েছে। গত ২৪ মার্চ ট্রাম্পের সাথে আলোচনার পর মোদী জানিয়েছিলেন যে, পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত কার্যকরী মতবিনিময় হয়েছে।
এর আগে, গত ২৩ মার্চ, ২০২৬ তারিখে লোকসভা (Lok Sabha)-য় এক বিশেষ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী এই যুদ্ধ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছিলেন। তিনি সেখানে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, এই সংঘাতের ফলে উদ্ভূত কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। জ্বালানি তেল, সার, এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে, কোভিড-১৯ (COVID-19) মহামারীর সময় ভারতের মানুষ যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একজোট হয়ে লড়াই করেছিল, ঠিক একইভাবে এই সংকটময় মুহূর্তেও সবাইকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী মোদী আরও নিশ্চিত করেন যে, সাধারণ পরিবারগুলোকে যাতে কোনো ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতি বা মূল্যবৃদ্ধির মতো বড় সমস্যার সম্মুখীন না হতে হয়, তার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ভারত সবসময়ই মানবতা ও শান্তির পক্ষে। তাই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা আন্তর্জাতিক পানিপথ অবরোধ করাকে ভারত সম্পূর্ণ ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মনে করে। মোদী জোর দিয়ে বলেন, সংঘাতের পথে না হেঁটে যেকোনো সমস্যার একমাত্র সমাধান হতে পারে আলোচনা এবং কূটনীতির মাধ্যমে। উত্তেজনা কমানো এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতির জন্য ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপ নিবেদিত রয়েছে।


Recent Comments