back to top
Sunday, April 12, 2026
Leaderboard Ad Space (728x90) - Responsive
Homeদেশমণিপুরের জ্বলন্ত উপত্যকা: নিজেদের ঘরেই আজ যারা উদ্বাস্তু

মণিপুরের জ্বলন্ত উপত্যকা: নিজেদের ঘরেই আজ যারা উদ্বাস্তু

এক অঘোষিত গৃহযুদ্ধ, বাফার জোনের কাঁটাতার এবং নিদারুণ রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বাস্তব খতিয়ান।

মইরাং ত্রংলাওবি গ্রামের সেই ধ্বংসস্তূপের কথা ভাবুন। দিনটি ছিল ৭ এপ্রিল, ২০২৬। একটি অত্যাধুনিক রকেট সদৃশ বিস্ফোরক আছড়ে পড়ল একটি সাধারণ মেইতেই বাসভবনে, প্রাণ কেড়ে নিল পাঁচ বছরের এক শিশু এবং ছয় মাসের এক একরত্তির । এটি গাজার কোনো দৃশ্যপট নয়, কিংবা সিরিয়ার কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রান্তর নয়। এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য মণিপুরের বর্তমান বাস্তব চিত্র। গত তিন বছর ধরে এই ভূখণ্ড এমন এক জাতিগত বিদ্বেষের আগুনে পুড়ছে, যা নেভানোর ক্ষমতা বা সদিচ্ছা, কোনোটিই যেন রাষ্ট্রযন্ত্রের নেই।

২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত শুধু যে কয়েকশো প্রাণ কেড়ে নিয়েছে তা নয়, বরং একটি গোটা রাজ্যকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিকভাবে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে। আজ মণিপুর মানেই সারি সারি চেকপোস্ট, কাঁটাতারের বেড়া, এবং এক অজানা আতঙ্কের নাম। যে রাজ্যটি একসময় তার নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ধ্রুপদী নৃত্য এবং পাহাড়-উপত্যকার ঐক্যের জন্য পরিচিত ছিল, তা আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল সশস্ত্র শিবিরে। কিন্তু এই রক্তপাতের দায় কার? এটি কি কেবল একটি আকস্মিক বিস্ফোরণ, নাকি দশকের পর দশক ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এক কাঠামোগত রাজনৈতিক বঞ্চনার চূড়ান্ত পরিণতি?

মাটির দখল নাকি অস্তিত্বের সংকট? এক চিলতে উপত্যকা আর বিস্তীর্ণ পাহাড়ের দ্বৈরথ

মণিপুরের রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের শেকড় লুকিয়ে আছে তার অদ্ভুত এবং অসম ভৌগোলিক কাঠামোর মধ্যে। রাজ্যের মোট ২২,৩২৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মাত্র ১০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে ইম্ফল উপত্যকা । অথচ এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডেই বসবাস করেন রাজ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ, যাদের অধিকাংশই মেইতেই সম্প্রদায়ের । ইম্ফল শুধু প্রশাসনিক রাজধানী নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। অন্যদিকে, রাজ্যের বাকি ৯০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে দুর্গম পাহাড় এবং বনাঞ্চল, যা মূলত কুকি-জো এবং নাগা উপজাতিদের বাসভূমি ।

এই ভৌগোলিক বিভাজনকে আরও জটিল করে তুলেছে আইনি বৈষম্য। ১৯৬০ সালের মণিপুর ল্যান্ড রেভিনিউ অ্যান্ড ল্যান্ড রিফর্মস অ্যাক্ট (MLR&LR) অনুযায়ী, উপত্যকার বাইরে পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো অ-উপজাতি মানুষ জমি কিনতে বা স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারেন না । ভারতীয় সংবিধানের ৩৭১সি (371C) অনুচ্ছেদ পাহাড়ি জেলাগুলিকে বিশেষ স্বায়ত্তশাসন এবং আইনি সুরক্ষা প্রদান করেছে । মেইতেই সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এই আইন তাদের নিজেদের রাজ্যেই কোণঠাসা করে ফেলেছে। জনসংখ্যা বাড়ছে, অথচ তাদের বসবাসের জায়গা সেই ১০ শতাংশ উপত্যকাতেই সীমাবদ্ধ । অন্যদিকে, পাহাড়ি উপজাতিদের গভীর আশঙ্কা—এই আইনি বর্ম সরিয়ে নিলে, আর্থিকভাবে শক্তিশালী মেইতেইরা রাতারাতি পাহাড় দখল করে নেবে এবং উপজাতিরা তাদের নিজস্ব আদিবাসভূমিতেই ভূমিহীন হয়ে পড়বে । জমি দখলের এই ভয় এবং অস্তিত্ব রক্ষার এই নিরন্তর সংগ্রামই মণিপুরের প্রতিটি সংঘাতের মূল ইন্ধন।

১৯৪৯ সালের সংযুক্তি এবং অবিশ্বাসের ঐতিহাসিক ক্ষত

বর্তমান সংকটকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের পাতায়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের বিদায়ের পর মণিপুর কিছু সময়ের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, যার নিজস্ব একটি সংবিধানও ছিল । কিন্তু ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে, ভারত সরকারের চাপের মুখে মণিপুরের মহারাজা ‘মার্জার এগ্রিমেন্ট’ বা অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন । অনেক মেইতেই ঐতিহাসিকের মতে, এই চুক্তিটি ছিল সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক এবং বলপূর্বক, কারণ তৎকালীন নির্বাচিত রাজ্য বিধানসভার কোনো মতামত এতে নেওয়া হয়নি ।

আরো পড়ুন:  Mathura Tension: উত্তরপ্রদেশে গোরক্ষকের মৃত্যু ঘিরে পুলিশ ও জনতার খণ্ডযুদ্ধ, মথুরায় চরম উত্তেজনা

এই জোরপূর্বক সংযুক্তির ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (UNLF) এবং পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA)-এর মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলি । অন্যদিকে, পাহাড়েও সমান্তরালভাবে নাগা এবং কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি নিজেদের ভূখণ্ড ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে । নব্বইয়ের দশকে (১৯৯২-১৯৯৭) কুকি এবং নাগাদের মধ্যে যে ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গা হয়েছিল, তাতে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন । সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস মণিপুরকে শিখিয়েছিল কীভাবে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে ভৌগোলিক সীমানা তৈরি করতে হয়। ২০২৩ সালের মেইতেই-কুকি সংঘাত আসলে সেই পুরনো ক্ষতেরই এক নতুন, আরও ভয়ংকর সংস্করণ ।

২০২৩ সালের স্ফুলিঙ্গ: সবুজ পাহাড় থেকে আগুনের প্রান্তর?

২০২৩ সালের মে মাসে যে দাবানল জ্বলে উঠেছিল, তার প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নংথমবাম বীরেন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার পাহাড়ি অঞ্চলে ব্যাপকভাবে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে । সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখলের অভিযোগে কুকি গ্রামগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং সরকারি স্তরে কুকিদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘মাদক পাচারকারী’ হিসেবে দেগে দেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা শুরু হয় ।

এই বারুদের স্তূপে দেশলাই জ্বালানোর কাজটি করে মণিপুর হাইকোর্ট। ১৯ এপ্রিল, ২০২৩-এ হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির একটি বেঞ্চ রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয়, মেইতেই সম্প্রদায়কে তফশিলি উপজাতি (ST) তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি যেন তারা দ্রুত বিবেচনা করে । এই নির্দেশ পাহাড়ি উপজাতিদের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করে। তারা বুঝতে পারে, মেইতেইরা উপজাতি তকমা পেলে পাহাড়ের জমি কেনা এবং সংরক্ষণের সুবিধা—দুই দিক থেকেই উপজাতিরা সর্বস্বান্ত হবে ।

এরই প্রতিবাদে ৩ মে অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুর (ATSUM)-এর ডাকে একটি সংহতি মিছিল বের হয় । চূড়াচাঁদপুরএবং বিষ্ণুপুর জেলার সীমান্তবর্তী তোরবুং-কাংভাই এলাকায় এই মিছিলকে কেন্দ্র করে প্রথম সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় । মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই সংঘাত পুরো রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কুকি জনতা উপত্যকায় মেইতেইদের বাড়িঘরে আগুন লাগায়, আর ইম্ফলে মেইতেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি কুকি বসতিগুলিতে নারকীয় ধ্বংসলীলা চালায় । সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই সময় উন্মত্ত জনতা পুলিশের অস্ত্রাগার লুট করে হাজার হাজার স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রচুর গোলাবারুদ ছিনিয়ে নেয় । রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যত নিজের পতন নিজেই নিশ্চিত করে, এবং একটি সাধারণ দাঙ্গা নিমেষে এক পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়।

আরো পড়ুন:  'দিল্লি চলো' মিশন! আজ লোকসভায় অভিষেকের 'কামান দাগার' অপেক্ষা, টার্গেট বাজেট বঞ্চনা আর 'SIR' ইস্যু

কাঁটাতারের ওপারে নিজেদের রাজ্য: নিজের দেশেই আজ যারা উদ্বাস্তু

আজ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মণিপুরের সবচেয়ে মর্মান্তিক বাস্তবতা হলো এর ‘বাফার জোন’ বা বিভাজন রেখা। উপত্যকা এবং পাহাড়ের সীমানায় মোতায়েন করা কেন্দ্রীয় বাহিনী এই অঘোষিত সীমান্তগুলি তৈরি করেছে, যাতে মেইতেই এবং কুকিরা একে অপরের সংস্পর্শে আসতে না পারে । রাজ্য সরকার খাতায়-কলমে এদের ‘স্পর্শকাতর এলাকা’ বললেও, বাস্তবে এগুলি অভেদ্য আন্তর্জাতিক সীমান্তের মতোই কাজ করছে । এই বিভাজনের ভয়াবহতা এতটাই যে, মণিপুরের নির্বাচিত সাংসদ ড. আংগোমচা বিমল আকোইজামকে শুধুমাত্র তার মেইতেই পরিচয়ের কারণে নিজের সংসদীয় এলাকার সাইতন গ্রামে প্রবেশ করতে দেয়নি নিরাপত্তা বাহিনী ।

এই সংঘাতের মানবিক মূল্য অপরিসীম। ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসেবেই ২৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যদিও স্বাধীন সংস্থাগুলির মতে এই সংখ্যা ৪০০-এর কাছাকাছি । প্রায় ৬০ হাজার মানুষ চিরতরে নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে আজ রাজ্যের ৩৬০টি ত্রাণ শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন । এই শিবিরের পরিস্থিতি ভয়াবহ; চরম ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং খাদ্যের তীব্র সংকট নিত্যদিনের সঙ্গী। অনেক শিবিরে প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে মাত্র ৪০০ গ্রাম চাল দেওয়া হয়, যা বেঁচে থাকার জন্য নিদারুণ উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয় । ৪,৭৮৬টি বাড়ি এবং ৫৩২টিরও বেশি ধর্মীয় উপাসনালয় (৪০০টি গির্জা এবং ১৩২টি মন্দির) পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে এই যুদ্ধ শুধু জমির নয়, মনস্তত্ত্বেরও ।

প্রশাসনের পক্ষাঘাত এবং নিরাপত্তার প্রহসন

মণিপুর যখন জ্বলছে এবং রাজ্য প্রশাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, তখন নয়াদিল্লির ভূমিকা ছিল চরম হতাশাজনক এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত। প্রথম কয়েক মাস দেশের প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি এবং এই ভয়াবহ সংকটে ২০২৫ এর সেপ্টেম্বর মাসের আগে একবারের জন্যও মণিপুরে পা না রাখা কেবল প্রশাসনিক উদাসীনতা নয়, বরং এক চরম রাজনৈতিক অমানবিকতার পরিচয়। যেখানে একটি গোটা রাজ্য গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়ছে, সেখানে দেশের প্রধান নির্বাহীর এই শারীরিক ও দৃশ্যমান অনুপস্থিতি রাজ্যের মানুষের মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল করেছে যে, দিল্লি তাদের সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছে।

রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা যখন পুরোপুরি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, তখন সংবিধানের ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে ব্যর্থ রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করার যে সাংবিধানিক এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা কেন্দ্রের ছিল, তারা তা পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেরিতে নেওয়া পদক্ষেপ এবং শান্তি রক্ষার নামে প্রহসনমূলক কমিটি গঠন কোনো কাজেই আসেনি, কারণ সেই কমিটিগুলোতে সংঘাতরত গোষ্ঠীগুলোর প্রকৃত প্রতিনিধিদের কোনো আস্থাই ছিল না। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ভোটব্যাঙ্কের হিসাবনিকাশ মানুষের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বীরেন সিং সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠার পর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয় । এক বছর পর, ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইউমনাম খেমচাঁদ সিংয়ের নেতৃত্বে একটি নতুন জোট সরকার শপথ গ্রহণ করে । খেমচাঁদ সরকার প্রথম কুকি-জো মহিলা উপ-মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করে এবং গুয়াহাটিতে কুকি-জো কাউন্সিলের সাথে শান্তি আলোচনায় বসে একটা ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতা বিন্দুমাত্র বদলায়নি ।

আরো পড়ুন:  নয়ডায় বাঙালি সাংবাদিকের বাড়িতে বঙ্গপুলিশের হানা নিয়ে তোপ মালব্যর

কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যে প্রায় ২৮৮ কোম্পানি (প্রায় ২৯,০০০ জওয়ান) আধাসামরিক বাহিনী (CAPF) নামিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা করছে । কিন্তু গোটা দেশ জুড়ে সিএপিএফ (CAPF) এবং আসাম রাইফেলসে ৯৩,১৩৯টি পদ ফাঁকা থাকার কারণে মোতায়েন করা এই বাহিনীগুলোর ওপর অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক চাপ পড়ছে । সবচেয়ে হাস্যকর এবং বিপজ্জনক বিষয়টি হলো, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর নিজেদের মধ্যেই কোনো সমন্বয় নেই। উপত্যকা-নিয়ন্ত্রিত মণিপুর পুলিশকে উপজাতিরা বিশ্বাস করে না, আবার মেইতেইরা মনে করে আসাম রাইফেলস কুকিদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট । পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মণিপুর পুলিশ আসাম রাইফেলসের জওয়ানদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এফআইআর (FIR) দায়ের করছে । একদিকে সেনাবাহিনী যখন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অভিযান চালাচ্ছে, ঠিক তখনই তাদের ত্রাণ শিবিরগুলিতে সাধারণ মানুষের ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে ।

কেন্দ্রীয় সরকার তড়িঘড়ি করে ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের ‘ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম’ (FMR) বাতিল করে এবং কাঁটাতারের বেড়া বসিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে । তাদের যুক্তি, এই উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়েই মাদক এবং অস্ত্র ঢুকছে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে চলে আসা আন্তঃসীমান্ত আত্মীয়তা এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে একটি কলমের খোঁচায় মুছে ফেলা কি আদৌ সম্ভব, না কি এটি কেবল মূল রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার আরেকটি সস্তা কৌশল?

শান্তির মরীচিকা: কবে নিভবে এই আগুন?

মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, যখন কোনো রাষ্ট্রযন্ত্র তার নিজের নাগরিকদের প্রতি নিরপেক্ষতার মাপকাঠি হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজ কীভাবে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়। দীর্ঘ ২১৬ দিনের ইন্টারনেট শাটডাউন করে অথবা হাজার হাজার সেনা নামিয়ে সাময়িকভাবে বন্দুকের নল হয়তো ঠান্ডা রাখা যায়, কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের অবিশ্বাস আর ঘৃণার আগুন নেভানো যায় না ।

মণিপুর আজ আর ভারতের মানচিত্রের কেবল একটি রাজ্য নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। যতদিন না পাহাড় ও উপত্যকার মানুষের এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর হচ্ছে, যতদিন না জমি, পরিচয় এবং স্বায়ত্তশাসনের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলিকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির বাইরে গিয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হচ্ছে—ততদিন মণিপুরে শান্তি এক অধরা মরীচিকা হয়েই থাকবে। বাফার জোনের কাঁটাতারের এপার আর ওপার—দুদিকেই আসলে পরাজিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্র কেবল দর্শকাসনে বসে সেই পতনের ধারাভাষ্য দিয়ে চলেছে।

তথ্যসূত্র ও সত্যতা যাচাই

প্রতিবেদনের বিষয় উৎস ও লিংক
ভৌগোলিক ও জনতাত্ত্বিক কাঠামোWikipedia: “Imphal Valley”
Link: https://en.wikipedia.org/wiki/Imphal_Valley
Census of India, 2011
আইনি বৈষম্য ও ৩৭১সি অনুচ্ছেদGKToday: “Article 371C”
Link: https://www.gktoday.in/article-371c/
E-Pao: “Land Rights of Tribal State Land Laws 1”
Link: https://e-pao.net/epPageExtractor.asp?src=features.Land_Rights_of_Tribal_State_Land_Laws_1.html
১৯৪৯ অন্তর্ভুক্তি চুক্তি ও বিদ্রোহের শুরুWikipedia: “Manipur”
Link: https://en.wikipedia.org/wiki/Manipur
Ziviler Friedensdienst: “Interrogating Peace – The Naga – Kuki Conflict”
Link: https://www.ziviler-friedensdienst.org/sites/default/files/media/file/2022/zfd-friedensinseln-1159_9.pdf
২০২৩ সালের সংঘাতের সূত্রপাতThe Times of India: “Manipur HC revokes directive…”
Link: https://timesofindia.indiatimes.com/city/imphal/manipur-hc-revokes-directive-to-consider-st-status-for-meiteis/articleshow/107923668.cms
IWGIA: “Understanding the complex conflict unfolding in Manipur”
Link: https://iwgia.org/en/news/5329-understanding-
প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতিGenocide Watch: “The Manipur Crisis: Four Months of Unending Violence”
Link: https://www.genocidewatch.com/single-post/the-manipur-crisis-four-months-of-unending-violence
Persecution.org: “Hundreds of Houses of Worship Destroyed…”
Link: https://persecution.org/2023/06/16/hundreds-of-houses-of-worship-destroyed-in-manipur-india/
বাফার জোন (Buffer Zones)The Economic Times: “Manipur’s ‘buffer zone’ threatens to harden ethnic divisions now”
Link: https://economictimes.indiatimes.com/news/india/manipurs-buffer-zone-threatens-to-harden-ethnic-divisions-now/articleshow/126533179.cms?from=mdr
Imphal Reviews: “Buffer Zones Become De Facto Borders…”
Link: https://imphalreviews.in/buffer-zones-become-de-facto-borders-of-manipurs-silent-separation/
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন (২০২৫-২০২৬)The Economic Times: “Yumnam Khemchand Singh takes oath as Manipur Chief Minister”
Link: https://m.economictimes.com/news/india/yumnam-khemchand-singh-takes-oath-as-manipur-chief-minister/articleshow/127910097.cms
The Hindu: “Yumnam Khemchand Singh set to be next Manipur CM…”
Link: https://www.thehindu.com/news/national/manipur/bjp-legislature-party-leader-manipur/article70587906.ece
নিরাপত্তা বাহিনীর সংকট ও সমন্বয়হীনতাThe Wire: “Over 93,000 Posts in Central Armed Police Forces and Assam Rifles Vacant…”
Link: https://m.thewire.in/article/government/over-93000-posts-in-central-armed-police-forces-and-assam-rifles-vacant-govt-tells-rajya-sabha/amp
Siasat.com: “Fabricated attempts to malign image of Assam Rifles: Army”
Link: https://www.siasat.com/fabricated-attempts-to-malign-image-of-assam-rifles-army-2662858/
৭ এপ্রিল, ২০২৬-এর বিস্ফোরণThe Hindu: “4 dead in fresh Manipur violence”
Link: https://www.thehindu.com/news/national/manipur/2-children-killed-in-bomb-attack-in-manipur/article70832734.ece
Borderlens: “Arrests in Manipur killings as UNKA denies role…”
Link: https://www.borderlens.com/2026/04/09/arrests-in-manipur-killings-as-unka-denies-role-amid-continued-tension/
ইন্টারনেট শাটডাউন ও অর্থনৈতিক ক্ষতিTIME: “2023 Was the Worst Year for Internet Shutdowns Globally”
Link: https://time.com/6978512/internet-shutdowns-india-report/
SFLC.in: “Internet Shutdowns Tracker”
Link: https://internetshutdowns.in/
ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম (FMR) বাতিলPMF IAS: “India suspends FMR with Myanmar”
Link: https://www.pmfias.com/india-suspends-fmr-with-myanmar/
The Hindu: “Centre yet to formally scrap Free Movement Regime with Myanmar”
Link: https://www.thehindu.com/news/national/fmr-with-myanmar-yet-to-be-scrapped-formally-mha-tightens-regulations-for-border-population/article69026504.ece

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Demo Ad
Sponsored Links

Most Popular

Recent Comments