নাগরিক অধিকার রক্ষার আইনি লড়াইয়ে ফের একবার উত্তপ্ত হয়ে উঠতে চলেছে দেশের শীর্ষ আদালত। ‘ভোটারদের কার্যত ধাক্কা দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো থেকে বের করে দিচ্ছে ট্রাইব্যুনাল’— ঠিক এই ভাষাতেই গুরুতর অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) দ্বারস্থ হলেন একদল মামলাকারী। নিউজস্কোপ বাংলার কাছে আসা খবর অনুযায়ী, নাগরিকত্ব নির্ধারণ এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার এই বিতর্কিত প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে।
কী অভিযোগ উঠেছে ট্রাইব্যুনালগুলির বিরুদ্ধে?
মামলাকারীদের মূল অভিযোগ, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলি (Foreigners Tribunal) অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্যপ্রমাণ এবং নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করেই একতরফা রায় দিচ্ছে। বহু প্রকৃত ভারতীয় (Indian) নাগরিককে শুধুমাত্র সন্দেহের বশে বা সামান্য কিছু নথির অমিলের কারণে ‘সন্দেহভাজন ভোটার’ বা ডি-ভোটার তকমা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দশকের পর দশক ধরে এই দেশে বসবাসকারী বহু মানুষ হঠাৎ করেই নিজেদের ভোটাধিকার হারাচ্ছেন। পিটিশনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইনি প্রক্রিয়ার নামে আসলে প্রকৃত ভোটারদের কার্যত ঘাড়ধাক্কা দিয়ে সিস্টেমের বাইরে বের করে দেওয়া হচ্ছে, যা সংবিধানবিরোধী।
আসাম এবং সীমান্তবর্তী রাজ্যের চরম সংকট
বিশেষ করে আসাম (Assam) এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বেশ কিছু সীমান্তবর্তী এলাকায় এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। সেখানে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি প্রক্রিয়ার পর থেকেই ট্রাইব্যুনালগুলির ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। বহু গরিব, খেটে খাওয়া মানুষ—যাঁদের কাছে হয়তো বংশপরম্পরায় জমির নিখুঁত দলিল বা জন্মের শংসাপত্র নেই, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন। একবার ট্রাইব্যুনাল কাউকে বিদেশি ঘোষণা করলে, তাঁকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর মতো কড়া পদক্ষেপও নেওয়া হয়ে থাকে। এর আগে গুয়াহাটি (Guwahati) হাইকোর্টেও এই ধরনের বেশ কিছু মামলার দীর্ঘ শুনানি হয়েছে। কিন্তু তাতেও আশানুরূপ সুরাহা না মেলায় এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় সন্তুষ্ট না হতে পেরে, এবার সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আর্থিক দুর্দশা
আইনজীবী ও সমাজকর্মীদের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি আইনি সমস্যা বা ভোটার তালিকার ত্রুটি নয়, এটি একটি চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। ভারতের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার দেয়। কিন্তু অভিযোগ, ট্রাইব্যুনালে অনেক সময়ই সেই পর্যাপ্ত সুযোগ এবং সময় দেওয়া হচ্ছে না সাধারণ মানুষকে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র ভোটার কার্ডে সামান্য নামের বানানের ভুলের জন্য কিংবা বয়সের সামান্য গরমিলের কারণে পুরো পরিবারকে বিদেশি সাব্যস্ত করা হচ্ছে। দিনের পর দিন ট্রাইব্যুনালে চক্কর কাটতে গিয়ে এবং আইনজীবীর খরচ জোগাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন দিনমজুর থেকে শুরু করে প্রান্তিক কৃষকরা। ভিটেমাটি বিক্রি করে নিজেদের ভারতীয় প্রমাণ করার এই মরিয়া লড়াই অনেকের জীবনেই চরম হতাশা ডেকে এনেছে।


Recent Comments