আলো নিভেছে, স্টল ভেঙেছে, ঘরে ফিরে গেছে বইপাগল বাঙালি। কিন্তু উৎসব শেষের পর করুণাময়ীর সেন্ট্রাল পার্ক বা ‘বইমেলা প্রাঙ্গণ’-এর যে ছবি আজ সকালে ফুটে উঠল, তা এক কথায় লজ্জাজনক। আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার ৪৯তম সংস্করণ শেষ হওয়ার ঠিক দু’দিন পর, মাঠের চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটিই ছিল সংস্কৃতির পীঠস্থান। সবুজের বদলে মাঠ ঢেকে আছে প্লাস্টিকের চাদরে।
কী দেখা যাচ্ছে মাঠে? আজ সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, গোটা মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার প্লাস্টিকের গ্লাস, থার্মোকলের প্লেট, খাবারের প্যাকেট এবং ছেঁড়া লিফলেট। মেলার সময় যেখানে ‘ধুলো-মুক্ত’ পরিবেশ রাখার জন্য জল ছিটানো হতো, আজ সেখানে আবর্জনার স্তূপের ওপর দিয়ে উড়ছে ধুলোর ঝড়। অথচ, প্রতিবারের মতো এবারও গিল্ড এবং প্রশাসনের তরফে ঘোষণা করা হয়েছিল—এটি হবে ‘প্লাস্টিক-মুক্ত’ এবং ‘পরিবেশবান্ধব’ বা গ্রিন ফেয়ার।
মর্নিং ওয়াকারদের ক্ষোভ: রোজ সকালে যারা সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটতে আসেন, তাঁদের ক্ষোভ আজ চরমে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং পরিবেশকর্মী অনিল দত্তর কথায়, “বইমেলা আমাদের গর্ব, কিন্তু মেলা শেষের এই ছবিটা আমাদের লজ্জা। সল্টলেকের ফুসফুস বলা হয় এই সেন্ট্রাল পার্ককে। সেখানে এই পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য মাটির কী ক্ষতি করছে, তা কেউ ভাবছে না। গ্রিন ফেয়ারের নামে শুধুই নাটক হয়।”
অভিযোগ উঠছে, মেলা চলাকালীন পর্যাপ্ত ডাস্টবিন থাকলেও, দর্শকদের একাংশ সচেতনভাবে তা ব্যবহার করেননি। আবার মেলার শেষে সাফাইকর্মীরা দ্রুত বাঁশ ও ত্রিপল খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও, মাঠ পরিষ্কার করার কাজে দেখা যাচ্ছে চরম অনীহা।
প্রশাসনের দায় কার? এই জঞ্জাল সাফাইয়ের দায় কার—পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড নাকি বিধাননগর পুরনিগম? এই প্রশ্নে শুরু হয়েছে একে অপরের দিকে আঙুল তোলার পালা। গিল্ডের এক কর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউস্কোপ বাংলাকে জানালেন, “আমরা পুরসভাকে সাফাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট ফি দিয়েছি। মেলা শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মাঠ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা। কেন দেরি হচ্ছে, আমরা খোঁজ নিচ্ছি।” অন্যদিকে পুরসভার সাফাই বিভাগের দাবি, মেলার পর এত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য জমেছে যে তা সরাতে কিছুটা সময় লাগছে। কালকের মধ্যে মাঠ পরিষ্কার হয়ে যাবে।
পরিবেশের ওপর প্রভাব: পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্লাস্টিক বর্জ্য যদি দ্রুত সরানো না হয়, তবে তা মাটির সঙ্গে মিশে সেন্ট্রাল পার্কের বাস্তুতন্ত্র বা ইকো-সিস্টেম নষ্ট করে দেবে। এছাড়া, সামনেই বসন্তকাল। গাছে গাছে নতুন পাতা আসার সময়। এই সময় মাটির উর্বরতা নষ্ট হলে তা গাছের জন্যও ক্ষতিকর।
কলকাতার গর্ব বইমেলা। কিন্তু সেই গর্বের শেষে যদি পড়ে থাকে একরাশ আবর্জনা, তবে তা আমাদের নাগরিক সচেতনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। সংস্কৃতি মানে কি শুধু বই কেনা? নাকি নিজের শহরকে পরিষ্কার রাখাও সংস্কৃতিরই অঙ্গ? আগামী বছর সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ বা ৫০তম বইমেলার আগে এই প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই গেল।
