চিনির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এবার সাধারণ মানুষের হেঁশেলে নতুন উদ্বেগ পেঁয়াজের দাম। শহর ও শহরতলির বিভিন্ন খুচরো বাজারে এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। পাইকারি ব্যবসায়ীদের একাংশের আশঙ্কা, সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।
গত বছরের একই সময়ে যেখানে অনেক বাজারে পেঁয়াজের দাম ছিল প্রায় ৩০ টাকা প্রতি কেজি, সেখানে এবার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। পাইকারি বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়েছে খুচরো বাজারে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাইরে থেকে পেঁয়াজের জোগান কমে যাওয়ায় তাঁদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে।
বাংলায় পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও সারা বছর রাজ্যের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। রাজ্যে মূলত শীতের মরসুমে পেঁয়াজ চাষ হয়। ডিসেম্বর নাগাদ বীজ রোপণের পর ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চ মাসের মধ্যে ফসল ওঠে। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত স্থানীয় পেঁয়াজ বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্ষার সময় স্থানীয় উৎপাদন কমে গেলে মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ-সহ দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা পেঁয়াজের উপরই নির্ভর করতে হয় বাংলাকে।
বর্তমানে সেই ভিন্রাজ্যের সরবরাহেই দেখা দিয়েছে সমস্যা। মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে পেঁয়াজ আসার পরিমাণ কমেছে বলে জানিয়েছেন পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা। কর্নাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকেও প্রত্যাশিত পরিমাণে পেঁয়াজ আসছে না। এর সঙ্গে পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারদর আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভর করে রবি মরসুমের উপর। মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে উৎপাদিত পেঁয়াজ তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। দেশের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশই এই সময়ে হয়। ফলে মে থেকে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত দেশের বাজার মূলত এই সংরক্ষিত পেঁয়াজের উপর নির্ভরশীল থাকে। সরবরাহ কমে গেলে বা বাজারে মজুত পেঁয়াজ ধীরে ছাড়া হলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে পেঁয়াজের মোট উৎপাদন খুব একটা কম হয়নি। তবে উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি গুণগত মান নিয়েও সমস্যা দেখা দিয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ উৎপাদক রাজ্য মহারাষ্ট্রে এ বছর আবহাওয়ার অনিয়মিত আচরণ চাষে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অসময়ের বৃষ্টি, বর্ষা দেরিতে শুরু হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে ভালো মানের পেঁয়াজের উৎপাদন কম হয়েছে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত।
পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকারও উদ্যোগ নিয়েছে। মহারাষ্ট্র থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ ট্রেনে পেঁয়াজ পাঠানো শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি শহরে সড়কপথেও পেঁয়াজ সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কলকাতাও সেই তালিকায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় তুলনামূলক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনও সাধারণ বাজারে তার বিশেষ প্রভাব পড়েনি।
বর্তমানে কলকাতার বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের দাম গুণমান অনুযায়ী ৫৫ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। বড় আকারের পেঁয়াজের দাম তুলনামূলক বেশি, মাঝারি ও ছোট পেঁয়াজও আগের তুলনায় অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নতুন খরিফ মরসুমের পেঁয়াজ বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে না আসা পর্যন্ত দামে বড় ধরনের স্বস্তি মিলবে না। কর্নাটক-সহ দক্ষিণ ভারতের কিছু অঞ্চলের নতুন পেঁয়াজ আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে বাজারে আসতে শুরু করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। সেই কারণে অক্টোবরের আগে পেঁয়াজের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে পেঁয়াজ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। রাজ্যে উৎপাদিত পেঁয়াজ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে রাখা গেলে বর্ষার সময়ে ভিন্রাজ্যের উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। অতীতে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য পরিকাঠামো তৈরিতে সরকারি ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হলেও বাস্তবে সেই প্রকল্প কতটা সফল হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে।
পুজোর মরসুমের আগে তাই পেঁয়াজের ক্রমবর্ধমান দাম মধ্যবিত্তের চিন্তা আরও বাড়াচ্ছে। নতুন ফসল বাজারে না আসা পর্যন্ত বাঙালির হেঁশেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উপকরণের ঝাঁঝ যে আরও কিছুদিন চোখে জল আনতে পারে, সেই আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি।


Recent Comments