ভুটানে হিমবাহসৃষ্ট হ্রদ ভেঙে হড়পা বানের জেরে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায়। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সতর্কতা জারি করেছিল প্রশাসন। বিশেষ নজর রাখা হচ্ছিল জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলার নদীগুলির জলস্তরের উপর। তবে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সঙ্কোশ নদীর জলস্তরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি না হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ভুটান সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভুটানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গাসা জেলার শিন্টাফু হিমবাহসৃষ্ট হ্রদ থেকে আচমকা বিপুল পরিমাণ জল বেরিয়ে আসে। হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া এই হ্রদের জল উপচে পড়ায় মো ছু নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পায়। প্রবল জলস্রোতের কারণে ভুটানের একাধিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির খবর সামনে এসেছে। গাসা শাচু উষ্ণ প্রস্রবণ সংলগ্ন পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি পুনাখা-গাসা সড়কের কিছু অংশ জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। একটি জলসেচ প্রকল্পও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে খবর।
ভুটানে হড়পা বানের প্রভাব পড়তে পারে উত্তরবঙ্গ ও অসমের কিছু এলাকায়—এই আশঙ্কায় আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করে প্রশাসন। বিশেষ করে আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম ব্লক এবং সঙ্কোশ নদী সংলগ্ন এলাকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়। নদীর জলস্তর বাড়লে যাতে দ্রুত বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়। পাশাপাশি সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ, সিভিল ডিফেন্স এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে শুক্রবার সকালে সঙ্কোশ নদীর জলস্তর খুব একটা না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন কুমারগ্রাম ব্লকের বাসিন্দারা। আগের রাতে বন্যার আশঙ্কায় নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে কয়েকজন বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আতঙ্কে অনেকে রাত কাটান জাতীয় সড়কের উপরেও। কিন্তু সকালে নদীর জলস্তর স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকায় বেশ কয়েকজন বাসিন্দা বাড়ি ফেরার কথা ভাবছেন। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতির উপর নজরদারি এখনও অব্যাহত রয়েছে। উত্তরবঙ্গের নদীগুলির জলস্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকও জানিয়েছেন, সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় রাজ্য ও জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি রয়েছে। সঙ্কোশ নদী এবং তার শাখা নদীগুলির আশপাশে বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ভুটানের লায়া অঞ্চলেও বন্যার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ওয়াকিলা পর্বতের কাছাকাছি ওই এলাকায় কয়েকটি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে খবর। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সেনা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভুটানে থাকা ভারতীয় নাগরিকদেরও সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছে ভারতীয় দূতাবাস।
উল্লেখ্য, ভুটানের হিমবাহসৃষ্ট হ্রদগুলির মধ্যে শিন্টাফু অন্যতম বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত। ২০২১ সালের ২৬ অগস্ট এই হ্রদের জলস্তর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় মো ছু নদীতে হড়পা বান নেমেছিল। সেই ঘটনায় নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ার পাশাপাশি উষ্ণ প্রস্রবণ সংলগ্ন এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এবারের ঘটনায় ভুটানের একাধিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হলেও উত্তরবঙ্গে আপাতত বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতা বজায় রাখতে চাইছে প্রশাসন। নদীর জলস্তর বাড়তে দেখলে বা বিপদের কোনও লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বাসিন্দাদের।


Recent Comments