আজকের এই আধুনিক Digital যুগে প্রযুক্তি, ডাটা মাইনিং (Data Mining) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI কীভাবে আমাদের সমাজ, রাজনীতি এবং দৈনন্দিন যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে, তা নিয়ে সম্প্রতি কলকাতায় (Kolkata) একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। “পাওয়ার, ডাটা অ্যান্ড এথিক্স: টুওয়ার্ডস ক্রিটিক্যাল মেথডোলজিস ইন ডিজিটাল কমিউনিকেশন রিসার্চ” শীর্ষক এই বিশেষ অধিবেশনে উঠে এসেছে বর্তমান সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু চ্যালেঞ্চ ও তথ্য।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সঞ্চালনা করেন ডঃ ঝুমুর দত্তগুপ্ত (Dr. Jhumur Duttagupta)। এছাড়াও আলোচনা পর্বের সভাপতিত্ব ও বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেন অধ্যাপক বুড়োশিব দাশগুপ্ত (Prof. Buroshiva Dasgupta), অধ্যাপক সুবীর ধর (Prof. Subir Dhar), অধ্যাপক দেবাঞ্জন ব্যানার্জী (Prof. Debanjan Banerjee) এবং ডঃ একায়েতে জর্জ (Dr. Ekaete George)।
ডিজিটাল মাধ্যমে ভোট ব্যাংক ও ‘নেটনোগ্রাফি’র ভূমিকা
আলোচনার শুরুতেই অধ্যাপক বুড়োশিব দাশগুপ্ত (Prof. Buroshiva Dasgupta) বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়া (Social Media) প্ল্যাটফর্মগুলির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে, প্রথাগত গণমাধ্যম বা ট্র্যাডিশনাল মিডিয়া সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং রাজনৈতিক প্রচারের সিংহভাগ এখন নিয়ন্ত্রণ করছে বিভিন্ন ধরনের মিম (Memes), ভাইরাল ভিডিও, হ্যাশট্যাগ (Hashtags) এবং অনলাইন ক্যাম্পেইন।
ভারত (India) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) এর মতো গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি দেখান, কীভাবে রাজনৈতিক দলগুলি ডাটা মাইনিং এবং AI ব্যবহার করে সাধারণ ভোটারদের মনস্তত্ত্ব ও আচরণকে প্রভাবিত করছে। পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) সাম্প্রতিক রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপির (BJP) মধ্যে যে ডিজিটাল যুদ্ধ চলে, তাতে আঞ্চলিক অস্মিতা, দুর্নীতি, জনকল্যাণমুখী প্রকল্প এবং জনমিতির পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় হাতিয়ার করা হয়। এই ধরনের অনলাইন ট্রেন্ড এবং ডিজিটাল সমাজকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য তিনি ‘নেটনোগ্রাফি’ (Netnography)-কে একটি অত্যন্ত কার্যকর গবেষণা পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
শুধু ডাটা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সঠিক বিশ্লেষণ
অধ্যাপক সুবীর ধর (Prof. Subir Dhar) তাঁর বক্তব্যে গবেষণার গুণগত মানের ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, শুধুমাত্র রাশি রাশি তথ্য বা বিগ ডাটা (Big Data) সংগ্রহ করলেই সঠিক গবেষণা হয় না, যদি না তার সঠিক মানবিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ করা যায়। মানুষ ও প্রযুক্তির এই নিবিড় সম্পর্কের যুগে অ্যালগরিদম (Algorithm) আমাদের পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণ করে দিচ্ছে এবং পরোক্ষভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই এই বিগ ডাটার যুগে তথ্যের উৎস এবং তার ব্যবহার নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
ডিজিটাল বৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের লড়াই
বিশ্বের সব প্রান্তে ডিজিটাল সুবিধা সমান নয়— এই চরম বাস্তবটি মনে করিয়ে দেন ডঃ একায়েতে জর্জ (Dr. Ekaete George)। তিনি নাইজেরিয়া (Nigeria) এবং সমগ্র পশ্চিম আফ্রিকার (West Africa) গ্রামীণ এলাকার কথা উল্লেখ করে জানান, যখন একটি বড় অংশ ইন্টারনেটের সুবিধা পাচ্ছে, ঠিক তখনই একটি বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এই পরিমণ্ডল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। প্রযুক্তির এই অ্যালগরিদম অনেক সময়ই সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তাই ডিজিটাল গবেষণাকে শুধুমাত্র অনলাইনের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, মাটির কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও সমস্যার কথা তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
ক্ষমতা, ডাটা ও নৈতিকতার ত্র্যহস্পর্শ
অধ্যাপক দেবাঞ্জন ব্যানার্জী (Prof. Debanjan Banerjee) তাঁর বক্তব্যে ডিজিটাল মিডিয়ার দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি এর অন্ধকার দিকগুলি নিয়ে আলোচনা করেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসী (Privacy), সম্মতিহীন তথ্য সংগ্রহ, অ্যালগরিদমের পক্ষপাতিত্ব এবং দায়িত্বশীল রিসার্চ প্র্যাকটিসের অভাব নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বর্তমান ডিজিটাল বিশ্বে তিনটি শব্দকে সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে হবে—
- Power (ক্ষমতা): বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এবং রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে তথ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা।
- Data (তথ্য): মানুষের সার্চ হিস্ট্রি, ছবি, ভিডিও এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের সামগ্রিক রূপ।
- Ethics (নৈতিকতা): মানুষের গোপনীয়তা রক্ষা করা, প্রতারণা বা জালিয়াতি রুখে দেওয়া এবং মানসিক ক্ষতি থেকে ব্যবহারকারীকে বাঁচানো।
প্যানেল আলোচনার শেষে সমস্ত বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে, প্রযুক্তির সুবিধা অনেক থাকলেও এর অপব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষের অজান্তেই তাদের ব্রেন ওয়াশ করা সম্ভব। তাই আগামী দিনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং সুস্থ সমাজ গঠনে গবেষক ও সাধারণ নাগরিক উভয়কেই আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
এই বিশেষ আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে প্রফেসর সুরঞ্জন দাস (Prof. Suranjan Das), প্রফেসর আশুতোষ ঘোষ (Prof. Ashutosh Ghosh), প্রফেসর বি পি সঞ্জয় (Prof. BP Sanjay), প্রফেসর ডঃ ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায় (Prof. Dr. Dhrubajyoti Chattopadhyay), প্রফেসর ডঃ অনুপম বসু (Prof. Dr. Anupam Basu), প্রফেসর ডঃ মিনাল পারিক (Prof. Dr. Minal Pareek), নোশির কন্ট্রাক্টর (Noshir Contractor), চারু প্রজ্ঞা (Charu Pragya), ডঃ আনন্দ মিত্র (Dr. Ananda Mitra), ডঃ মৌসুমী ভট্টাচার্য (Dr. Mausumi Bhattacharyya), একায়েতে জর্জ (Ekaete George), ডঃ ঝুমুর দত্তগুপ্ত (Dr. Jhumur Duttagupta), ডঃ বুড়োশিব দাশগুপ্ত (Dr. Buroshiva Dasgupta), ডঃ সুবীর ধর (Dr. Subir Dhar) এবং প্রফেসর দেবাঞ্জন ব্যানার্জী (Prof. Debanjan Banerjee)-র মতো দেশ-বিদেশের একঝাঁক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মিডিয়া বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন।


Recent Comments